বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের ৫৫তম শাহাদাতবার্ষিকী আজ
করাচির মাশরুর বিমানঘাঁটি থেকে আকাশে উড়েছিল একটি প্রশিক্ষণ বিমান। সামনে ছিল অনিশ্চিত পরিণতি, আর হৃদয়ে ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন। সেই উড্ডয়ন থেকে আর ফিরে আসেননি ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান। মাত্র ২৯ বছর বয়সে যুদ্ধবিমান নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে শহীদ হন তিনি।
মতিউর রহমানের জন্ম ১৯৪১ সালের ২৯ অক্টোবর পুরান ঢাকার আগা সাদেক রোডে। ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলে পড়াশোনার পর তিনি সারগোদার পাকিস্তান বিমানবাহিনী পাবলিক স্কুলে ভর্তি হন। পরে পাকিস্তান বিমানবাহিনীতে যোগ দিয়ে পাইলট হিসেবে প্রশিক্ষণ নেন এবং ১৯৬৩ সালে কমিশন লাভ করেন। জেট কনভার্সন কোর্স শেষ করে তিনি দক্ষ জেট পাইলট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পেশোয়ারের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিমান মহড়ায় একমাত্র বাঙালি পাইলট হিসেবেও অংশ নেন তিনি।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ছুটিতে দেশে এসে যুদ্ধের বাস্তবতা কাছ থেকে দেখেন মতিউর। স্থানীয় প্রতিরোধেও তাঁর সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায়। পরে পাকিস্তানে ফিরে গেলেও স্বাধীন বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষা তাঁকে তাড়িয়ে বেড়ায়। একপর্যায়ে তিনি পাকিস্তানের সামরিক কাঠামো ছেড়ে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
১৯৭১ সালের ২০ আগস্ট করাচির মাশরুর বিমানঘাঁটি থেকে একটি টি-৩৩ প্রশিক্ষণ বিমান নিয়ে ভারতমুখী হওয়ার চেষ্টা করেন মতিউর রহমান। বিমানের কল সাইন ছিল ‘ব্লু বার্ড-১৬৬’। উদ্দেশ্য ছিল মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়া।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সকাল ১১টা ১৫ মিনিটের দিকে উড্ডয়নের পর বিমানের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘাত তৈরি হয়। একপর্যায়ে বিমানটি সিন্ধুর বেদিন এলাকায় বিধ্বস্ত হয়। এতে মতিউর রহমান ও পাকিস্তানি পাইলট অফিসার মিনহাজ রশীদ নিহত হন।
শহীদ হওয়ার পর মতিউর রহমানকে করাচির মাশরুর বিমানঘাঁটির একটি কবরস্থানে দাফন করা হয়। স্বাধীনতার পরও তাঁর দেহাবশেষ দীর্ঘদিন পাকিস্তানেই ছিল। শহীদ হওয়ার ৩৫ বছর পর, ২০০৬ সালের ২৪ জুন তাঁর দেহাবশেষ বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হয়। পরদিন রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তাঁকে পুনঃসমাহিত করা হয়।
মতিউর রহমান ছিলেন একজন প্রশিক্ষিত পাইলট, সামরিক কর্মকর্তা, স্বামী ও বাবা। কিন্তু সব পরিচয়ের ঊর্ধ্বে তিনি ছিলেন এমন একজন মানুষ, যিনি সংকটের মুহূর্তে নিজের দেশকে বেছে নিয়েছিলেন। তিনি জানতেন, সেই সিদ্ধান্তের পরিণতি হতে পারে মৃত্যু। তবুও স্বাধীনতার স্বপ্নকে নিজের নিরাপত্তার চেয়ে বড় করে দেখেছিলেন।
তাই ২০ আগস্ট শুধু তাঁর শাহাদাতের দিন নয়; এটি দেশপ্রেম, আত্মত্যাগ এবং স্বাধীনতার জন্য নেওয়া এক সাহসী সিদ্ধান্তেরও স্মারক।
এনএনবাংলা/

