নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির জাগরণ ঘটানোই আমাদের মহাপরিকল্পনা: রেজাউদ্দিন স্টালিন

কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন একজন বাংলাদেশী কবি, লেখক ও টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব। তার রচিত কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা ৪৫টি।তার জন্ম ১৯৬২ সালের ২২শে নভেম্বর ঝিনাইদহ জেলার কালিগঞ্জ উপজেলার নলভাঙ্গা গ্রামে। কবিতায় অবদানের জন্য তিনি ২০০৬ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তিনি একজন আলোচিত ব্যক্তিত্ব। কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৫ থেকে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।তিনি সম্প্রতি দ্য নিউ নেশনের সাথে এক সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন দ্য নিউ নেশনের এসাইনমেন্ট এডিটর মোহাম্মদ আবদুল অদুদ।
নিউ নেশন: বিগত সরকারের আমলে শিল্পকলা একাডেমিতে নানা বিশৃঙ্খলা ও অব্যবস্থাপনা ছিল। এটা আপনি কতখানি দূরীভূত করতে পেরেছেন?
রেজাউদ্দিন স্টালিন: আমি যোগদানের পর থেকে শিল্পকলা একাডেমি একটা শান্তিপূর্ণ জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে। এখানে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কিছু দাবি-দাওয়া আছে, দীর্ঘদিন পদোন্নতি না হওয়ায় কিছু ক্ষোভ আছে। আর কিছু অনৈক্যও আছে। আমি বিষয়টিকে এড্রেস করেছি অফিসিয়ালি। আমি নজরুল ইনস্টিটিউটে ৩৫ বছর ধরে চাকুরি করার সুবাদে সরকারি চাকুরিবিধি, নিয়মনীতি সম্পর্কে আমার সম্যক ধারনা আছে। দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতি বঞ্চিত হওয়ায় অনেকের মধ্যে একটা ক্ষোভ-অস্থিরতা বিরাজ করছে। নানা কারণে এমন যাদেরকে প্রমোশন দিতে পারছি না, তাদের কাউকে কাউকে শুন্যপদে চলতি দায়িত্ব দিয়েছি। তাদেরকে মেধা ও যোগ্যতা অনুযায়ী কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছি। জেলাগুলোতে আমি যোগ্য অফিসারদের পদায়ন করেছি। যারা এখানে সত্যিকার অর্থে অফিস না করে নানা রকম বিশৃঙ্খলা করে, দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত তাদের কাউকে কাউকে আমি বদলি করেছি। সব আমি পারিনি। কিন্তু আমি যতটা করেছি, এর ফলে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ফিরে এসেছে।
নিউ নেশন: আপনি নতুন বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বিকাশে জন্য কী কী কর্মসূচি হাতে নিয়েছেন?
রেজাউদ্দিন স্টালিন: নতুন বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বিকাশে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে স্বপ্ন দেখছেন, তা বাস্তবায়নে শিল্পকলা একাডেমি নিরলসভাবে কাজ করে চলেছে। আমি নতুন বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক উৎকর্ষের জন্য ব্যাপক কর্মসুচি হাতে নিয়েছি। আমরা আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছি। আমরা আমাদের লোক গান ও ট্রাডিশনাল যে গান রয়েছে, তার সাথে সাথে আধুনিক গানের অনুষ্ঠান করেছি। আমরা নৃত্য উৎসব, সঙ্গীত উৎসব করছি। চলচ্চিত্র, নাট্য ও যাত্রা উৎসব করছি। এসবের মধ্য দিয়ে আমরা আমাদের শিল্পী সাহিত্যিকদেরকে শিল্পকলার সাথে যুক্ত করছি। চিত্রকলায় নানা ধরনের অনুষ্ঠান করেছি। এশিয়ান ভিনাল যেটা হয়, তার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি। আমরা তরুণ আর্টিস্টদের এক্সিভিশন করেছি। জুলাই আর্টক্যাম্প করেছি। তাদের ছবি এখন প্রদর্শিত হচ্ছে। আমরা ঈদ উৎসব, দুর্গোৎসব ও বড় দিন উৎসব করেছি।
আমরা সাবিনা ইয়াসমিন, রুনা লায়লা ও সৈয়দ আবদুল হাদীকে সম্মাননা দিয়েছি। জাতীয় কবি নজরুল ইসলামের জন্মবার্ষিকীতে সারাদেশে একযোগে দুই দিন ব্যাপি উৎসব করেছি। ২১শে ফেব্রুয়ারি, বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস উদযাপন করেছি। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের নিয়ে উৎসব করেছি পয়লা বৈশাখে, যেটা সার্বজনীন একটা উৎসব, সেখানে আমাদের বড় রকমের অংশগ্রহণ ছিল। নজরুলের লেটো গান, তার কবিতার সাথে গানের কিউরেশন করে নতুনভাবে উপস্থাপন করার ব্যবস্থা করেছি।
আমি মনে করি, নজরুল শুধু বিদ্রোহী সত্তা নয়, নজরুল প্রেমেরও, নজরুল বিরহেরও, নজরুল সার্বজনীন এক কবি সত্তা। নজরুল সাম্য, সম্প্রীতি ও স্বাধীনতার রূপকার। নজরুলবর্ষে তার গান ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু দুস্তর পারাবার’ থিম সং হিসেবে সামনে আনছি। ‘ওই নতুনের কেতন ওড়ে কাল বৈশাখীর ঝড়’ নিয়ে একটা অর্কেস্ট্রা করেছি। যন্ত্রশিল্পী ও নাট্যশিল্পীদের কসরতের জন্য আলাদা একটা কক্ষ দিয়েছি। হলগুলোতে প্রতিবন্ধীদের জন্য রেয়াত দিয়েছি। এখন যেহেতু বিদ্যুতের দাম বেড়ে গিয়েছে, তাই সব সময় ফ্রি দিতে পারি না।
নিউ নেশন: বিলুপ্তপ্রায় যাত্রাশিল্প, সার্কাস, পুতুল নাচ ও মাইম আর্ট বা মুকাভিনয় নিয়ে আপনাদের ভাবনা কি?
রেজাউদ্দিন স্টালিন: বাংলাদেশের গ্রামবাংলায় যাত্রাশিল্প এবং সার্কাস অত্যন্ত জনপ্রিয় হলেও সেগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল, আমরা চালু রাখার চেষ্টা করছি। আমরা পুতুল নাচের যে অ্যাক্রোবেটিক দল আছে রাজবাড়িতে, তাদেরকে এনে কেন্দ্রীয়ভাবে অনুষ্ঠান করেছি। আমরা মাইম আর্ট চর্চার ব্যবস্থা করছি। কিছুদিন আগে আমাদের একটি দল ভুটান গিয়েছে, সেখানে মাইম প্রদর্শিত হয়েছে এবং তারা অনেক প্রশংসা কুড়িয়েছে। জেলাগুলোতেও এধরনের অনুষ্ঠান চলমান রাখার চেষ্টা করছি।
নিউ নেশন: জাতীয়ভাবে সাংস্কৃতিক বিকাশে সরকারের নিজস্ব কোনো বড় রকমের মাস্টারপ্লান আছে কি না?
রেজাউদ্দিন স্টালিন: হ্যাঁ, দেশীয় সংস্কৃতির বিকাশে সরকারের নিজস্ব মাস্টারপ্লান আছে। মাস্টারপ্লান হলো, আমাদের নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী যে সংস্কৃতি আছে, তার জাগরণ ঘটানো। আর সেজন্য সরকার অবিরাম কাজ করে যাচ্ছে। আমরা একটা সৃজনশীল অর্থনীতি এখানে নিয়ে আসতে চাই। আমরা শুধুই যে বিনামূল্যে সবকিছু করি, তা না করে আমরা সার্কাস দেখব টিকিট কেটে, যাত্রা দেখব টিকিট কেটে, নাটক দেখব টিকিট কেটে, গান শুনব টিকিট কেটে, এতে রেভিনিউ আসবে এবং রাজস্ব বাড়বে। পাশাপাশি বিনোদনটাও সুন্দর হবে, আনন্দময় হবে। আমাদের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সংস্কৃতি, সমতলের সংস্কৃতি, মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, সাওতাল, চাকমা, মারমা, মণিপুরী, গারো সবাই মিলে একটা ঐক্যতান তৈরি করার চেষ্টা করছি।
নিউ নেশন: বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বিএফডিসির সাথে শিল্পকলা একাডেমির সম্পর্ক প্রশ্নে আপনার অবস্থান বলবেন?
রেজাউদ্দিন স্টালিন: আমরা বিএফডিসির সাথে রিনিউ করব, বাংলাদেশ টেলিভিশনের সঙ্গে শিল্পকলা একাডেমির সুসম্পর্ক বৃদ্ধির জন্য এমওইউ করব, যেন আমাদের অনুষ্ঠানগুলো বাইরে নিয়ে যেতে পারি এবং ব্যাপকভাবে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে পারি।
নিউ নেশন: ৬৪ জেলায় শিল্পকলার যে কমিটি, সেই কমিটির বর্তমানে কী অবস্থা?
রেজাউদ্দিন স্টালিন: ৬৪ জেলায় শিল্পকলার যে কমিটি, সেই কমিটির উপর এখন ইনজাংশন জারি করা আছে। এটা ইচ্ছাকৃতভাবে করে রেখেছে একটা গ্রুপ। সেজন্য একটা আহবায়ক কমিটি করার জন্য প্রস্তাব দিয়েছি। খুব শিগগিরই এটা হয়ে যাবে। আমাদের পরিচালনা পরিষদ আইন পরিবর্তিত হয়েছে, তার আলোকে পরিচালনা পরিষদও করছি।
নিউ নেশন: আপনি শিল্পকলা একাডেমির ডিজি বনাম কবি, আপনি একটিকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে অন্যটিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছেন না তো?
রেজাউদ্দিন স্টালিন: নিশ্চয়ই না। একজন কবির মধ্যে দেশপ্রেমটা থাকবে। যদি আমি দেশকে ভালোবাসি, দেশের সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করা, এগিয়ে নেয়া আমার নৈতিক দায়িত্ব। আমি আমার বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ। আমি মনে করি, আমাদের কবি, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী সবার অধিকার আছে শিল্পকলা একাডেমিতে আসার।
নিউ নেশন: আপনার পূর্বের ডিজির দুর্নীতি ও প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনাকে কীভাবে দেখছেন? আপনার বিরুদ্ধে দুর্নীতির গুঞ্জন আছে কি না?
রেজাউদ্দিন স্টালিন: এটা সরকার নিশ্চয়ই দেখবে। দুর্নীতি দমন কমিশন দেখবে। আমার কাজ আমি যখন শুরু করেছি, তখন থেকে।
আমার বিরুদ্ধে গুঞ্জন কেন থাকবে? আমি তো গুঞ্জনের বাইরের লোক। আমি ৩৫ বছর নজরুল ইনস্টিটিউটে ছিলাম। আর একজন কবি হিসেবে আমি সবাইকে নিয়ে কাজ করতে চাই। বাংলাদেশে যদি আপনি কাজ করেন, তাহলে এক পক্ষ থাকবে আপনার বিরোধিতা করার জন্য। ভালো কাজ করলেই মনে করবে, ও এত ভালো কেন করছে?
নিউ নেশন: নতুনদের জন্য আপনার ওপেন ডোর পলিসি কতটা ফলপ্রসু?
রেজাউদ্দিন স্টালিন: আমরা তো সবসময় নতুনদেরকে প্রাধান্য দেই। তারুণ্যকে সবসময় অগ্রাধিকার দেই। বিশেষ করে বিভিন্ন মাধ্যমের নতুন শিল্পীদের তালিকাভুক্ত করছি। আপনি জেনে খুশি হবেন যে, আমাদের লিটল ম্যাগাজিন বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে। এটাই কিন্তু নতুন বাংলাদেশ গঠনে আমাদের তরুণদের প্রতিভা বিকশিত করবার বড় জায়গা। সেটা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, আমরা চালু করেছি।
নিউ নেশন: আপনার অফিসে প্রাতিষ্ঠানিক অব্যবস্থাপনা কতটা আছে?
রেজাউদ্দিন স্টালিন: আমার অফিসে প্রাতিষ্ঠানিক অব্যবস্থাপনা সেরকম নেই। তবে সব জায়গায় গ্রুপিং আছে। গ্রুপিংয়ের জায়গাটা ঠিক করতে হলে ওদের চাওয়াটা কী, সেটা জানতে হবে এবং সেটাকে গুরুত্ব দিতে হবে। আমি চাই, সবাই মিলেমিশে থাকুক। নিজের অফিস, নিজের জায়গা। এখানে গ্রুপিং করে তো বেশিদূর আগাতে পারবে না।
অনেক মহাপরিচালক এখানে থাকতে পারেননি, গ্রুপিংয়ের কারণে। আমি প্রতিষ্ঠানকে গ্রুপিং থেকে মুক্ত রাখার চেষ্টা করি। আমি অনেকটা সফল হয়েছি।
নিউ নেশন: প্রত্যেকটা জেলায় শিল্পকলার বাজেট বরাদ্দ কত ও সেখানে কোনো অনিয়ম হয় কি না?
রেজাউদ্দিন স্টালিন: প্রতিটি জেলায় সরকার বছরে ৬ লক্ষ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয় শিল্পকলার জন্য। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় কিছু দেয় এবং আমরা আমাদের সামর্থ অনুযায়ী একটা বরাদ্দ দেই। কোনো জেলায় নতুন অনুষ্ঠান করতে বললে তাদেরকে কিছু বরাদ্দ দেয়া হয়।
নিউ নেশন: সাক্ষাৎকার দেয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
রেজাউদ্দিন স্টালিন: আপনাকেও ধন্যবাদ। নিউ নেশন আমার খুব প্রিয় কাগজ। নিউ নেশনে আমার অনেক লেখা প্রকাশিত হয়েছে। নিউ নেশন একটি ভালো ও নিরপেক্ষ সংবাদপত্র। মত প্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে নিউ নেশন পাঠকপ্রিয়, সেজন্য আমি নিউ নেশনকে পছন্দ করি।
