বোয়িং-এয়ারবাসের দ্বৈরথে বাংলাদেশে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ চায় ইইউ

বাংলাদেশের উড়োজাহাজ কেনার বাজারে বোয়িংয়ের পাশাপাশি ইউরোপীয় নির্মাতা এয়ারবাসকেও সমান সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার। তিনি বলেছেন, এয়ারবাসের প্রস্তাব অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক এবং বিষয়টি বাংলাদেশকে ‘খুব গুরুত্ব সহকারে’ বিবেচনা করা উচিত।
রোববার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে ইইউভুক্ত ২৭টি দেশের রাষ্ট্রদূত ও প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেন মাইকেল মিলার।
তিনি বলেন, ‘আমাদের দৃষ্টিতে এয়ারবাসের একটি অবিশ্বাস্য প্রতিযোগিতামূলক অফার রয়েছে। এটিকে খুব গুরুত্ব সহকারে নেওয়া উচিত। আমরা এয়ারবাস ও বিমানের মধ্যে খুব দ্রুত আলোচনা সমাপ্তির প্রত্যাশা করছি।’
সরকারি ক্রয়ে সমান প্রতিযোগিতার আহ্বান
বাংলাদেশের সরকারি ক্রয় সিদ্ধান্তে কোনো নির্দিষ্ট দেশের কোম্পানিকে অগ্রাধিকার না দিয়ে বাণিজ্যিক যোগ্যতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ইইউ রাষ্ট্রদূত।
মাইকেল মিলার বলেন, ‘আমরা সব ক্ষেত্রে একটি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির অনুরোধ করছি। আপনি যদি কোনো সরকারি ক্রয়ের সিদ্ধান্ত নেন, তা যেন বাণিজ্যিক যোগ্যতার ভিত্তিতে নেওয়া হয় এবং আমাদের কোম্পানিগুলো যেন যেকোনো দেশের কোম্পানির সঙ্গে তাদের সাধ্যমতো সর্বোত্তম প্রতিযোগিতা করতে পারে।’
১৪ বোয়িং উড়োজাহাজ কিনছে বিমান
বিভিন্ন আলোচনা ও দর-কষাকষির পর গত ৩০ এপ্রিল মার্কিন উড়োজাহাজ নির্মাতা বোয়িংয়ের সঙ্গে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স।
চুক্তি অনুযায়ী এসব উড়োজাহাজ কিনতে বাংলাদেশের ব্যয় হবে ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৪৫ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা। প্রতি ডলার ১২২ টাকা ৭৩ পয়সা হিসাবে এ অর্থের হিসাব করা হয়েছে। ২০৩১ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে ধাপে ধাপে এসব উড়োজাহাজ সরবরাহ করবে বোয়িং।
সম্প্রতি বাংলাদেশের কাছে বোয়িংয়ের উড়োজাহাজ বিক্রির বিষয়টি এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তুলে ধরেন মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত সার্জিও গোর। সেখানে তিনি আরও বড় একটি চুক্তির ইঙ্গিত দেন।
গোর বলেন, ‘চলতি সপ্তাহেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে আরেকটি অসাধারণ চুক্তি হয়েছে। এর আওতায় বাংলাদেশ বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যা তাদের প্রাথমিক ক্রয়াদেশের চেয়ে অনেক বেশি।’

তারেক রহমানকে ট্রাম্পের ধন্যবাদ
বাংলাদেশ বোয়িংয়ের উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে চিঠি দিয়ে ধন্যবাদ জানান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
চিঠিতে ট্রাম্প বলেন, ‘বোয়িং আপনাকে হতাশ করবে না, আমিও বিষয়টি ভুলব না। এ বিষয়ে মনোযোগের জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। খুব বেশি দিন নয়, অদূর ভবিষ্যতেই আপনার সঙ্গে সাক্ষাতের প্রত্যাশা করছি।’
একই দিনে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত সাংবাদিকদের জানান, বাংলাদেশ ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ কিনছে। পাশাপাশি আরও উড়োজাহাজ লিজ নেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।
এয়ারবাসের সঙ্গেও চলছে আলোচনা
এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ১০টি এয়ারবাস কেনার নীতিগত সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়েছিল। তবে জুলাই অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতন এবং যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কের চাপের মধ্যে শেষ পর্যন্ত বিমানের উড়োজাহাজ কেনার অর্ডার যায় বোয়িংয়ের কাছে।
তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষ থেকে এয়ারবাসকে সমান সুযোগ দেওয়ার চাপের মধ্যে বাংলাদেশ সরকার এয়ারবাসের কাছ থেকেও উড়োজাহাজ কেনার বিষয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
বাণিজ্য ও বিনিয়োগ নিয়েও আলোচনা
রোববারের বৈঠকে বাংলাদেশ ও ইইউর বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক, অশুল্ক বাধা দূর করা এবং ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর জন্য বাংলাদেশের ব্যবসায়িক পরিবেশ নিয়ে আলোচনা হয়।
এর আগে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের সঙ্গে বৈঠকেও মাইকেল মিলার অশুল্ক বাধা দূর করার পাশাপাশি বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণের ওপর জোর দেন।
ইইউর পক্ষ থেকে তখন বাংলাদেশের সামনে ৬১টি অশুল্ক বাধার বিষয় তুলে ধরা হয়েছিল। বাণিজ্যমন্ত্রী দাবি করেন, ছয় মাসে এর মধ্যে ৪৮টি বাধা দূর করেছে সরকার।
এর মধ্যে শতভাগ বিদেশি মালিকানাধীন লজিস্টিক কোম্পানির লাইসেন্স নবায়নসংক্রান্ত জটিলতা নিরসন, বাণিজ্যিক স্যাম্পল আমদানির বার্ষিক সীমা ১০ হাজার মার্কিন ডলার থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার ডলার করা এবং রপ্তানি পণ্যের ‘ট্রেসিবিলিটি’ নিশ্চিত করতে ব্যবহৃত স্ক্যানিং স্মার্ট কার্ডের শুল্কায়ন জটিলতা দূর ও যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণের বিষয়গুলো উল্লেখ করেন মন্ত্রী।
এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন নিয়ে ইইউর সমর্থন চায় বাংলাদেশ
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি গন্তব্য। এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন নিয়ে চলতি বছরের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে এবং এ বিষয়ে ইইউর সঙ্গে আলোচনা হয়েছে।
বাংলাদেশ এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার আবেদন করেছে জানিয়ে তিনি বলেন, জাতিসংঘের এ প্রক্রিয়ার দুটি ধাপ ইতোমধ্যে বাংলাদেশ অতিক্রম করেছে—ইউএন সিডিপি ও ইকোসক।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বিষয়টি উত্থাপিত হলে ইইউর সম্মতি পাওয়ার আশা প্রকাশ করেন তিনি।
এফটিএ নিয়েও আলোচনা হবে
ইইউ রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার জানান, চলতি সপ্তাহের শেষ দিকে বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বা এফটিএ নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
বৈঠকে অন্যদের মধ্যে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, এনবিআরের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আহসান হাবিব এবং বাণিজ্য ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
এনএনবাংলা/
