সাম্প্রতিক
Skip to content

রাষ্ট্রপতির আদেশে মওকুফ এনবিআরের ২০ কর্মকর্তার শাস্তি

এনবিআর দুই ভাগ করে রাজস্ব ব্যবস্থাপনা ও রাজস্ব নীতি নামে দুটি স্বতন্ত্র বিভাগ করলে আন্দোলনে নামেন এনবিআরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। ফাইল ছবি

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আন্দোলনে অংশ নেওয়ায় শাস্তির মুখে পড়া ২০ কর্মকর্তার দণ্ড মওকুফ করা হয়েছে। মার্জনা চেয়ে করা আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে রাষ্ট্রপতি তাদের শাস্তি বাতিলের আদেশ দিয়েছেন। এরই মধ্যে এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ (আইআরডি)।

রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) বিভিন্ন পর্যায়ের এসব কর্মকর্তার শাস্তি মওকুফ করে পৃথক পৃথক আদেশ জারি করে আইআরডি। আদেশে রাষ্ট্রপতির কাছে করা আবেদনের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দণ্ড মওকুফের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

এনবিআরের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, একই সময়ে শাস্তির মুখে পড়া আরও চার কর্মকর্তার দণ্ডও মওকুফ হতে পারে।

গত ১৮ আগস্ট অনুষ্ঠিত রাজস্ব সম্মেলনে এনবিআর কর্মকর্তারা তাদের বিরুদ্ধে নেওয়া শাস্তিমূলক ব্যবস্থা প্রত্যাহারের জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে আবেদন জানান। একই সঙ্গে শাস্তির আশঙ্কায় রাজস্ব আদায় কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কার কথাও তুলে ধরেন তারা। তখন সরকারপ্রধান অতীতের ভুল পেছনে ফেলে কর্মকর্তাদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান এবং শাস্তি মওকুফের আশ্বাস দেন।

আন্দোলনে ‘সংগঠকের ভূমিকা পালন’সহ বিভিন্ন অভিযোগে এসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মূল বেতন দুই ধাপ বা তারও বেশি কমানোর মতো শাস্তি দেওয়া হয়েছিল। কারও বিরুদ্ধে দেওয়া হয়েছিল লঘুদণ্ড।

দণ্ড মওকুফ হওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন এনবিআরের দ্বিতীয় সচিব (উপকমিশনার) মো. শাহাদাত জামিল, কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের রাজস্ব কর্মকর্তা শফিউল বশর, ঢাকা উত্তর কমিশনারেটের রাজস্ব কর্মকর্তা সবুজ মিয়া এবং খুলনার কাস্টমস মূল্যায়ন ও অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা কমিশনারেটের উপকমিশনার মোহাম্মদ সাইদুল ইসলাম।

এ ছাড়া কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট, চট্টগ্রামের কমিশনার (চলতি দায়িত্ব) মো. জাকির হোসেন, একই কমিশনারেটের যুগ্ম কমিশনার মো. সানোয়ারুল কবির, গাজীপুরের কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের অতিরিক্ত কমিশনার সাধন কুমার কুন্ডু, চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের অতিরিক্ত কমিশনার আ.আ.ম. আমীমুল ইহসান খান এবং ঢাকা পশ্চিমের অতিরিক্ত কমিশনার সিফাত-ই-মরিয়মের লঘুদণ্ড বাতিল করে দায় থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।

তালিকায় নিরীক্ষা, গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর, মূল্য সংযোজন কর, ঢাকার অতিরিক্ত কমিশনার হাছান মুহম্মদ তারেক রিকাবদারও রয়েছেন।

মওকুফ পাওয়া কর কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন কর অঞ্চল-ময়মনসিংহের যুগ্ম কর কমিশনার মোনালিসা শাহরীন সুস্মিতা, কর অঞ্চল-যশোরের যুগ্ম কর কমিশনার মো. মামুন মিয়া, কর অঞ্চল-গাজীপুরের অতিরিক্ত কর কমিশনার (চলতি দায়িত্ব) চাঁদ সুলতানা চৌধুরানী, কর অঞ্চল-২২, ঢাকার অতিরিক্ত কর কমিশনার (চলতি দায়িত্ব) সুলতানা হাবীব, কর অঞ্চল-যশোরের অতিরিক্ত কর কমিশনার মুরাদ আহমেদ, যুগ্ম কর কমিশনার মোহাম্মদ মোরশেদ উদ্দিন খান এবং ই-ট্যাক্স ম্যানেজমেন্ট ইউনিটের ঢাকার যুগ্ম কর কমিশনার মাসুমা খাতুন।

এনবিআর সংস্কার নিয়ে যে আন্দোলন

২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকার জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে দুই ভাগ করে ‘রাজস্ব ব্যবস্থাপনা’ ও ‘রাজস্ব নীতি’ নামে দুটি স্বতন্ত্র বিভাগ গঠনের জন্য অধ্যাদেশ জারি করে। এর প্রতিবাদে অধ্যাদেশ বাতিলের দাবিতে কলম বিরতিসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন শুরু করেন এনবিআরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

আন্দোলনের মুখে সরকার ওই অধ্যাদেশে ‘প্রয়োজনীয় সংশোধনী’ আনার কথা জানায়। ২০২৫ সালের ২২ মে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সংশোধনী না হওয়া পর্যন্ত বিদ্যমান কাঠামোতেই এনবিআরের সব কার্যক্রম চলবে।

এরপর তৎকালীন এনবিআর চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান খানের পদত্যাগের দাবিতে নতুন করে আন্দোলনে নামেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। একপর্যায়ে এনবিআর কার্যালয়ে তাকে ‘অবাঞ্ছিত’ ঘোষণা করা হয়।

দাবি আদায়ে ২৮ জুন ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি শুরু করেন এনবিআর কর্মীরা। এতে আমদানি-রপ্তানিসহ এনবিআরের বিভিন্ন কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। পরদিনও কর্মসূচি চলতে থাকলে অন্তর্বর্তী সরকার এনবিআরের সেবাকে ‘অত্যাবশ্যকীয়’ ঘোষণা করার সিদ্ধান্ত নেয়।

সংকট নিরসনে এনবিআর কর্মীদের দ্রুত কর্মস্থলে ফেরার পাশাপাশি আইনবিরোধী ও জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থি কার্যক্রম থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়। পরে সংকট সমাধানে পাঁচ উপদেষ্টাকে নিয়ে একটি উপদেষ্টা কমিটি গঠনের কথাও জানায় তৎকালীন সরকার।

তবে ব্যবসায়ী নেতাদের মধ্যস্থতায় আন্দোলনকারীদের প্ল্যাটফর্ম ‘এনবিআর সংস্কার ঐক্য পরিষদ’ শাটডাউন কর্মসূচি প্রত্যাহার করে নেয়।

এরপর আন্দোলনের সামনের সারির নেতাদের বিরুদ্ধে ‘দুর্নীতির তথ্যানুসন্ধান’ শুরু করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তিন দফায় ১৬ কর্মকর্তার তথ্যানুসন্ধান শুরুর তথ্য জানায় সংস্থাটি।

পরবর্তীতে বিএনপি সরকার গঠনের আগেই একের পর এক এনবিআর কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক সিদ্ধান্ত আসতে থাকে। অনেক কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়, আবার কারও বিরুদ্ধে লঘুদণ্ডসহ বিভিন্ন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এবার তাদের মধ্যে ২০ কর্মকর্তার দণ্ড রাষ্ট্রপতির আদেশে মওকুফ করা হলো।

এনএনবাংলা/