স্বচ্ছতা চায় যুক্তরাষ্ট্র, মার্কিন কোম্পানিকে ‘সর্বোচ্চ গুরুত্বের’ আশ্বাস বাণিজ্যমন্ত্রীর

দেশে তীব্র গ্যাস সংকটের মধ্যে সরকার যখন নতুন ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) স্থাপনে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা ভাবছে, তখন এ প্রক্রিয়ায় ‘স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক’ পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি ক্রিস্টেনসেন বলেছেন, এফএসআরইউ স্থাপনের প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক হলে বিদেশি উদ্যোক্তাদের আস্থা আরও বাড়বে। পাশাপাশি মার্কিন কোম্পানিগুলোও বাংলাদেশে কাজ করতে ‘অত্যন্ত আগ্রহী’ হবে।
সোমবার রাজধানীতে ব্যবসায়ীদের সংগঠন এফবিসিসিআই কার্যালয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের সঙ্গে বৈঠক করেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত। বৈঠকে এফএসআরইউ স্থাপন, আমদানি নীতি ও জ্বালানি সহযোগিতাসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। পরে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।
বৈঠকে ব্রেন্ট টি ক্রিস্টেনসেন বলেন, “বড় অবকাঠামো নির্মাণ উদ্যোগে একটি স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ বজায় রাখা গেলে বিদেশি উদ্যোক্তাদের আস্থা আরও সুদৃঢ় হবে।”
মার্কিন কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে কাজ করতে অত্যন্ত আগ্রহী উল্লেখ করে তিনি উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার সুযোগ নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন।
জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, “দ্রুততম সময়ে এফএসআরইউ নির্মাণের সক্ষমতা দেখাতে পারলে মার্কিন কোম্পানিগুলোর প্রস্তাব সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাবে। স্বল্প সময়ে কার্যকর এলএনজি সরবরাহ পরিকল্পনা উপস্থাপন, তাদের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করবে।”
সমুদ্রপথে আনা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি গ্রহণ ও সংরক্ষণ করা হয় ভাসমান টার্মিনাল বা এফএসআরইউতে। পরে সেখানে এলএনজিকে আবার গ্যাসে রূপান্তর করে পাইপলাইনের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়।
বর্তমানে মহেশখালীতে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল রয়েছে। এর একটি এক্সিলারেট এনার্জির এবং অন্যটি সামিট এলএনজি টার্মিনালের। দুটি টার্মিনালের দৈনিক গ্যাস সরবরাহ সক্ষমতা যথাক্রমে ৬০০ ও ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট।
দেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। স্বাভাবিক সময়ে দেশীয় উৎপাদন ও আমদানি করা এলএনজি মিলিয়ে দৈনিক প্রায় ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়।
এর মধ্যে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৬৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যায়। আর আমদানি করা এলএনজি থেকে আসে প্রায় ১ হাজার থেকে ১ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট।
ফলে দুটি এফএসআরইউয়ের যেকোনো একটি বন্ধ বা বিকল হলে দেশের সামগ্রিক গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব পড়ে।
সর্বশেষ গত ২১ জুলাই এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালের বৈদ্যুতিক ক্যাবলে আগুন লেগে সেটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে টার্মিনালটি থেকে দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়।
দুই সপ্তাহের বেশি সময় পর গত ৬ আগস্ট টার্মিনালটি আংশিকভাবে চালু হয়। তবে পরবর্তী সময়ে কারিগরি সমস্যা ও কার্গোর স্বল্পতার কারণে সেখান থেকে গ্যাস সরবরাহ কয়েক দফা ওঠানামা করে।
এ পরিস্থিতিতে বাসাবাড়ি ও শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা সরকারের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। সংকট কাটাতে ২০২৯ সালের মধ্যে দেশে আরও তিনটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে সরকার।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেছেন, “এর জন্য পায়রা, মোংলা ও হিরনপয়েন্টে টার্মিনাল বসানোর সম্ভাব্যতা যাচাই করা হচ্ছে। এ জন্য বিনিয়োগকারীও খোঁজা হচ্ছে।”
এরই মধ্যে খবর প্রকাশ হয়েছে, সরকার তৃতীয় এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের কাজ চীনের একটি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানকে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে বর্তমানে গ্যাস নিতে যে ব্যয় হচ্ছে, তার তুলনায় ৩৫ থেকে ৩৭ শতাংশ বেশি খরচ হতে পারে।
গত ১৯ জুন চায়না ন্যাশনাল এনার্জি ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোম্পানি (সিএনইই) মহেশখালীর কুতুবজোমে একটি অফশোর এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের প্রস্তাব দেয়। এতে দৈনিক ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট রিগ্যাসিফিকেশন সক্ষমতা এবং সর্বোচ্চ ৭৫০ মিলিয়ন ঘনফুট সক্ষমতার কথা বলা হয়েছে।
খবর অনুযায়ী, ১৫ বছরের চুক্তির আওতায় এফএসআরইউ নির্মাণের জন্য সিএনইই প্রতিদিন ৩ লাখ ৪২ হাজার ডলার নেবে। বর্তমানে এক্সিলারেট এনার্জির এফএসআরইউ বাবদ সরকারের দৈনিক খরচ ২ লাখ ৫৪ হাজার ডলার এবং সামিট এলএনজি টার্মিনালের জন্য ২ লাখ ৪৯ হাজার ১১৫ ডলার।
এদিকে বৈঠকে বাংলাদেশের আমদানি নীতি নিয়েও আলোচনা হয়। মার্কিন রাষ্ট্রদূত বলেন, নতুন আমদানি নীতিতে বেশ কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে, যা প্রশংসনীয়। তবে কিছু ধারা আরও ব্যবসাবান্ধব করার সুযোগ রয়েছে।
জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, “আমদানি নীতি একটি চলমান প্রক্রিয়া। বাজার ও অর্থনীতির বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রম নিয়মিত পর্যালোচনা করা হচ্ছে।”
জ্বালানি সহযোগিতার বিষয়ে রাষ্ট্রদূত ক্রিস্টেনসেন আন্তর্জাতিক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ‘গানভর’-এর সঙ্গে চুক্তিকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করেন।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, “সরকার প্রতিটি ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছে। ভবিষ্যতেও তা বজায় থাকবে।”
বৈঠকে শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুন নাসের খান, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মুস্তাফিজুর রহমান এবং মার্কিন দূতাবাসের ইকোনমিক চিফ অ্যাঞ্জেলো পালাজ্জেলো উপস্থিত ছিলেন।
এনএনবাংলা/
