ভালো দামের আশায় হিমাগারে আলু, এখন বাড়ছে লোকসানের পাহাড়
ধারদেনা করে আড়াই বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছিলাম। মৌসুমে দাম কম থাকায় সব আলু হিমাগারে রেখেছি। ভাবছিলাম পরে বেশি দামে বিক্রি করে ঋণ শোধ করব। কিন্তু এখন প্রতি বস্তা আলু বিক্রি করলেই ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা লোকসান হচ্ছে। ধার শোধ করা তো দূরের কথা, দিন দিন দেনার বোঝাই বাড়ছে। এখন কী করব, ভেবে ক‚লকিনারা পাচ্ছি না— কথাগুলো বলতে বলতে হতাশা ফুটে উঠছিল জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার বালাই গ্রামের আলুচাষি তোতা মিয়ার কণ্ঠে।
ভালো দামের আশায় হিমাগারে আলু সংরক্ষণ করেছিলেন তিনি। সেই আশা এখন পরিণত হয়েছে দুশ্চিন্তায়। শুধু তোতা মিয়াই নন, জয়পুরহাটের অসংখ্য আলুচাষি ও ব্যবসায়ী এবার একই সংকটে পড়েছেন। উৎপাদন মৌসুমে কম দামের কারণে হিমাগারে রাখা আলুর বাজারদর বাড়ার বদলে কম থাকায় এবং সংরক্ষণসহ অন্যান্য খরচ বেড়ে যাওয়ায় লোকসানের মুখে পড়েছেন তারা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে জয়পুরহাটের বিভিন্ন হিমাগারে বিপুল পরিমাণ বীজ ও খাওয়ার আলু সংরক্ষণ করা হয়েছে। জেলার ২২টি হিমাগারে প্রায় ২ লাখ ১৬ হাজার টন আলু সংরক্ষিত রয়েছে। এর বড় একটি অংশ এখনো হিমাগারেই রয়েছে। চাষি ও ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিপুল পরিমাণ আলু বাজারে বের করতে হলে সরবরাহ আরও বেড়ে যেতে পারে। এতে দাম আরও কমার আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে নতুন মৌসুমের আগাম আলু বাজারে আসতে শুরু করলে পুরোনো আলুর দাম আরও কমে যাওয়ার ভয়ও করছেন তারা।
কালাই উপজেলার বালাই গ্রামের আলুচাষি তোতা মিয়া বলেন, আমি প্রায় আড়াই বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছি। মৌসুমে আলুর দাম এত কম ছিল যে তখন বিক্রি করলে ধারদেনা শোধ করা সম্ভব ছিল না। তাই আরও কিছু ঋণ করে সব আলু হিমাগারে সংরক্ষণ করি।
তিনি আরও বলেন, তখন চিন্তা ছিল পরে বেশি দামে বিক্রি করে সব ঋণ শোধ করব। কিন্তু হিমাগার ভাড়া ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে প্রতি বস্তা আলুতে আমার খরচ হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৩০০ টাকা। এখন সেই আলু বিক্রি হচ্ছে ৮০০ থেকে ৮৫০ টাকায়। অর্থাৎ প্রতি বস্তায় ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা লোকসান হচ্ছে। সরকারের প্রতি সহায়তার আবেদন জানিয়ে তোতা মিয়া বলেন, আমাদের মতো কৃষকদের বাঁচাতে সরকার যেন দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেয়। আমরা কীভাবে ধারদেনা থেকে মুক্ত হয়ে পরিবার নিয়ে বাঁচব, সেই ব্যবস্থা করার জন্য সরকারের কাছে আমাদের বিনীত অনুরোধ।
আলুর বাজার মন্দায় চাষিদের পাশাপাশি ব্যবসায়ীরাও বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন। স্থানীয় আলু ব্যবসায়ী সোহেল রানা বলেন, বর্তমানে আলুর যে বাজারদর, তাতে প্রতি বস্তায় গড়ে প্রায় ৩০০ টাকা লোকসান হচ্ছে। প্রতি বস্তা আলু কিনে হিমাগারে সংরক্ষণ করতে সব মিলিয়ে প্রায় ১ হাজার ১৫০ টাকা খরচ হয়েছে। এখন বিক্রি করতে পারছি ৮৫০ থেকে ৮৭০ টাকায়। তিনি বলেন, পরপর দুই বছর ধরে লোকসান গুনছি। এভাবে চলতে থাকলে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে যাবে। সরকার দ্রুত আলু রপ্তানির উদ্যোগ নিলে বাজারদর কিছুটা বাড়তে পারে। তাতে লাভ না হলেও অন্তত মূলধন রক্ষা করা সম্ভব হবে।
হিমাগারেও আলু খালাসের গতি কম আলুর বাজার মন্দার প্রভাব পড়েছে হিমাগার ব্যবসাতেও। কম দামে আলু বিক্রি করতে অনাগ্রহী হওয়ায় অনেকেই হিমাগার থেকে আলু বের করছেন না। কালাইয়ের সালামিন কোল্ড স্টোরেজের ব্যবস্থাপক আইয়ুব আলী বলেন, বর্তমানে আলুর বাজার মন্দা। ফলে কৃষক, ব্যবসায়ী ও হিমাগার মালিক-কেউই ভালো নেই। ব্যবসায়ীরা লাভের চেয়ে লোকসানের মুখে পড়েছেন। তিনি বলেন, আলু আনলোড কম হচ্ছে। আলু বেচাকেনা কমে যাওয়ায় হিমাগারের ভাড়াও ঠিকমতো আদায় হচ্ছে না। আবার বিদ্যুতের বিল বেড়েছে। লোডশেডিংয়ের কারণে অনেক সময় ডিজেল দিয়ে জেনারেটর চালাতে হচ্ছে। সব মিলিয়ে হিমাগার পরিচালনার খরচ বাড়লেও আয় কমে গেছে।
আইয়ুব আলী জানান, সালামিন ফুডস লিমিটেডের আলু সংরক্ষণ ক্ষমতা প্রায় ১ লাখ ৪৫ হাজার বস্তা। এখন পর্যন্ত প্রায় ৪৫ হাজার বস্তা আলু আনলোড হয়েছে। এখনও প্রায় এক লাখ বস্তা আলু হিমাগারে রয়েছে। তিনি বলেন, মাত্র তিন মাসের মধ্যে এত বিপুল পরিমাণ আলু বের করা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠতে পারে। ২০২৫ সালে একই সময়ে এর চেয়ে অনেক বেশি আলু আনলোড হয়েছিল। এ বছর পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন।
চাষি ও ব্যবসায়ীদের দাবি, এবার আলু সংরক্ষণের ভাড়া ও অন্যান্য খরচ বেড়েছে। কোথাও কোথাও প্রতি বস্তা আলু সংরক্ষণে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত খরচ হচ্ছে। উৎপাদন খরচ, পরিবহন, শ্রমিক, হিমাগার ভাড়া ও অন্যান্য ব্যয় মিলিয়ে ৬০ কেজির এক বস্তা আলুর মোট খরচ দাঁড়াচ্ছে প্রায় ১ হাজার ১৫০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা পর্যন্ত। অথচ বর্তমানে হিমাগার থেকে সেই আলু বিক্রি হচ্ছে ৮০০ থেকে ৮৭০ টাকার মধ্যে। ফলে অনেক চাষি ও ব্যবসায়ী প্রতি বস্তায় কয়েক শ টাকা করে লোকসান গুনছেন।
কালাই পৌরসভার থুপসাড়া এলাকার আলু চাষি রকি ফকির বলেন, আলু চাষে সার, বীজ, শ্রমিক ও সেচের পেছনে অনেক টাকা খরচ হয়েছে। এরপর হিমাগারে রাখতে আবার আলাদা খরচ হয়েছে। এখন যে দামে আলু বিক্রি হচ্ছে, তাতে পুরো খরচই উঠছে না। তিনি বলেন, আর কিছুদিন আলু হিমাগারে রাখলে ভাড়া ও অন্যান্য খরচ বাড়বে। আবার এখন বিক্রি করলেও লোকসান। আমরা যেন দুই দিক থেকেই আটকে গেছি।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জয়পুরহাট জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ২২টি হিমাগারে প্রায় ২ লাখ ১৬ হাজার টন বীজ ও খাওয়ার আলু সংরক্ষণ করা হয়েছে। তবে উপজেলার হিমাগারের সংখ্যা নিয়ে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্যে ভিন্নতা রয়েছে। কৃষি বিভাগের চূড়ান্ত তথ্য যাচাই করে সংখ্যা উল্লেখ করা প্রয়োজন।
জয়পুরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মনজু আলম সরকার বলছেন, গত মৌসুমে জেলায় ব্যাপক আলু উৎপাদন হয়েছে এবং ফলনও ভালো হয়েছে। কিন্তু বাজারে সরবরাহ বেশি থাকায় প্রত্যাশিত দাম পাওয়া যাচ্ছে না। তার মতে, বাজারদর সামনে বাড়লে চাষি ও ব্যবসায়ীদের লোকসানের পরিমাণ কিছুটা কমতে পারে। তবে দাম না বাড়লে এবং ক্ষতি অব্যাহত থাকলে আগামী মৌসুমে জেলায় আলুর আবাদ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
চাষি, ব্যবসায়ী ও হিমাগার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে বাজার ব্যবস্থাপনায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
এনএনবাংলা/
