একখন্ড জমির স্বপ্নই অধরা সিলেটের হিজড়া জনগোষ্ঠীর
দিনের শুরুতেই অন্য সকল মানুষের মতো অন্ন বস্ত্রের জন্য ঘর থেকে বের হতে হয় তাদের। কিন্তু আর দশটা মানুষের মতো অর্থ যোগাড়ের উৎস এর পথটা তাদের জন্য বড়ই কণ্টকাকীর্ণ। প্রতি পদে পদে লাঞ্চনা-বঞ্চনা আর উপেক্ষায় একাকার হয়ে দিন শেষে একমুঠো চাল নিয়ে ঘরে ফিরতে হয়, নিজের কিংবা পরিবারের সদস্যদের জন্য। পাতে ঝুল বা তরকারি যাই হোক এর মাঝে সন্তষ্ট থাকতে হয় তাদেরকে।
সংবাদের সূচনা পড়ে অনেকেরই হয়তো বুঝতে বাকি নেই, কাদের কথা বলছিলাম। এরাও মানুষ তবে সমাজ তাদেরকে পরিচয় দিয়েছে হিজড়া হিসেবে। আর এই পরিচয়টাই যেন রঙিন কাপড় পরা মানুষগুলোর জীবনের জন্য এক অভিশাপ হয়ে উঠেছে। যে কারনে তাদের নেই মাথা গোঁজার ঠাঁই, নেই থাকা খাওয়ার সুব্যবস্থা, কিংবা ভালো একটা চাকরি। আর শিক্ষার যে অধিকার তাও তাদের বেলায় ভূলুণ্ঠিত।
সিলেটে বসবাসরত কয়েকটি হিজড়া পরিবারের জীবন সংগ্রাম অনুসন্ধানে এমন করুন চিত্রই ফুটে উঠেছে।
বিউটি (২৮) জীবনের একটি পর্যায়ে এসে জানতে পারেন তিনি আর দশটি পুরুষের মতো নয়, তখন থেকেই শুরু হয় লাঞ্চনার জীবন। বর্তমানে বসবাস করেন কদমতলীর একটি বাসায়। এখানে তার সঙ্গে আরো আট-দশ জনের বসবাস। ভোর হতেই দিন শুরু হয় তারও। পরিপাটি হয়ে ঠোঁটে লিপিষ্টিক গালে পাউডার মেখে রঙিন পোশাক গায়ে দিয়ে দলের সাথে বের হন বিউটি। কাটফাঠা রোদে সকাল থেকেই অবস্থান নেন হিলালপুর নামক স্থানে। বিয়ে কিংবা কোন অনুষ্ঠানের গাড়ীর বহর দেখলেই রাস্তার গতিরোধ করে দাঁড়ানোই তাদের কাজ। এক সঙ্গে হাততালি আর নাচ কেউ শেখায়নি, তবু এরই মাধ্যমে তারা বুঝিয়ে দেন তাদের অর্থের প্রয়োজন। না হলে এরা গা খালি করে নাচতেও দ্বিধা করে না,বাধ্য হয়েই লোকলজ্জা, মানসম্মান কিংবা মানবতার খাতিরেই হোক, গাড়ীতে থাকা লোকজন কিছু টাকা হাতে গুজে দিয়ে পার পেতে চান।
সানাই নামের আরেক যুবক তার দল নিয়ে মার্কেটে-মার্কেটে ঘুরে বেড়ায় একটু সাহায্যের জন্য, দক্ষিণ সুরমার বাইপাস এলাকার একটি কলোনিতে বাসকরা সানাইর সাথে আরো কয়েকজন আছেন। তাই বাধ্য হয়েই হাত পাতাকে জীবনের সঙ্গী হিসেবে বেছে নিয়েছেন তিনি।
মার্কেটে তার সাথে কথা হয়, আলাপকালে সানাই জানান, দেশের মাটিতে আলো বাতাসে বেড়ে উঠলেও এক খন্ড জমি নেই তাদের কারও। আর যে কারনেই জীবনটাই তাদের ছন্দহীন-গতিহীন। তাদেরকে কেউ বাসা ভাড়া দিতে চায়না। আবার কেউ ভাড়া দিলেও অন্য সব মানুষের মতো জীবন যাপনের সুযোগ পান না।
দেশে সরকারি বেসরকারি ভাবে হিজড়া জনগোষ্ঠীর নিয়ে একাধিক কর্মসূচি চালু থাকলেও তাদের বাসস্থানের প্রসঙ্গটা উঠলেই যেন আর কেউ এগুতে চান না। ফলে ছিন্নমূল মানুষের মতোই চলছে হিজড়া জনগোষ্ঠীর জীবন।
নগরীর বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অনেকেই দলবদ্ধভাবে ভাড়া বাসা বা নির্দিষ্ট আশ্রয়ে বসবাস করেন। ব্যক্তিগতভাবে একটি বাসা ভাড়া নিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন করার সুযোগ তাদের অনেকের জন্যই কঠিন। ফলে নিরাপদ ও স্থায়ী আবাসনের বদলে অনিশ্চিত পরিবেশে বসবাস করতে হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সিলেটের হিজড়া জনগোষ্ঠীর জীবনযুদ্ধে সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি হলো নিরাপদ আবাসন। সমাজের মূলধারায় বসবাসের সুযোগ থাকলেও বাড়ি ভাড়া নিতে গিয়ে নানা ধরনের বৈষম্য ও হয়রানির অভিযোগ রয়েছে। পরিচয় জানার পর অনেক বাড়িওয়ালা ভাড়া দিতে অনীহা প্রকাশ করেন—এমন অভিযোগ করেছেন স্থানীয় হিজড়া জনগোষ্ঠীর সদস্যরা।
অধিকার কর্মীদের মতে, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি তখনই অর্থবহ হবে যখন একজন হিজড়া মানুষও পরিচয়ের কারণে বাসা ভাড়া, নিরাপত্তা কিংবা স্বাভাবিক জীবনযাপনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবেন না। সিলেটের আবাসন সংকট তাই কেবল একটি জনগোষ্ঠীর সমস্যা নয়—এটি সমঅধিকার ও মানবিক মর্যাদার প্রশ্ন।
হিজড়া যুব কল্যাণ সংস্থার সভাপতি সুপ্তা হিজড়া বলেন, সিলেটে আমাদের জনগোষ্ঠীর মানুষকে খুব অসহায় ভাবে বসবাস করতে হচ্ছে। নিজস্ব বাসা না থাকার কারনে বিগত কয়েক বছর ধরে কদমতলীর একটা বিল্ডিং এ ভাড়া থাকতে হচ্ছে ।
তিনি আরও বলেন,ব্যক্তিগত ভাবে একটি বাসা ভাড়া নিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন করার সুযোগ তাদের অনেকের জন্যই কঠিন। ফলে নিরাপদ ও স্থায়ী আবাসনের বদলে অনিশ্চিত পরিবেশে বসবাস করতে হয় তাদের। যা তাদের জীবনকে আরো দূর্বিষহ করে তুলেছে।
সুপ্তা হিজড়া জানান, আমাদের নিরাপদ আবাসনের জন্য গত বছর সিলেটের জেলা প্রশাসক বরাবরে একটা লিখিত আবেদন করেছিলাম কিন্তু বার বার যোগাযোগ করে ও এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোন সুরাহা হয়নি। তারপরও আমরা আশাবাদী সরকার আমাদের জীবন মান উন্নয়নে একটি নিরাপদ আবাসনের সুযোগ করে দিবেন।
সিলেট জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তর এর উপ-পরিচালক আব্দুর রফিক বলেন, সিলেটের হিজড়া জনগোষ্ঠীকে কর্মক্ষম করে তুলতে নানা ধরনের প্রশিক্ষণ ও সহায়তা প্রদান করা হয় থাকে। কিন্তু তাদের সব মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করার সাধ্য আমাদের কারও একার পক্ষে সম্ভব নয়। তারপরও আমরা আমাদের অবস্থান তাদের নিরাপদ আবাসন নিশ্চিতে যথাসাধ্য চেষ্টা করছি।
এ ব্যাপারে সিলেটের জেলা প্রশাসক মোঃ আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, সিলেটের হিজড়া জনগোষ্ঠীর আবাসনের বিষয়টির ব্যাপারে খোঁজখবর নিয়ে বিস্তারিত জানাবেন।
এনএনবাংলা/
