বিলুপ্তির পথে হাকালুকি হাওরের রানি মাছ
এশিয়ার বৃহত্তম হাকালুকি হাওরের বিলুপ্ত প্রায় মাছের মধ্যে অন্যতম হলো রানি মাছ। এই মাছটি দেখতে যেমন সুন্দর তেমনি এর দামও অনেক বেশি। এক কেজি মাছের মূল্য ১ হাজার টাকা। এত দাম দিয়ে কিনতে চাইলেও অগ্রিম অর্ডার দিয়ে রাখতে হয়।
হাকালুকি হাওরকে মিঠা পানির মৎস্য প্রজনন কেন্দ্র বলা হয়ে থাকে। এই হাওরে পাওয়া যায় মিঠা পানির অনেক সুস্বাদু মাছ। সুস্বাদু মাছের তালিকায় শীর্ষে রানি মাছ ও পাবদা মাছ। এরমধ্যে রানী মাছ বর্তমানে বিলুপ্ত প্রজাতির মাছ। স্থানীয়ভাবে এই রানি মাছকে আবার অনেকে বউ মাছও বলে থাকে।
২০১২ সাল থেকে হাকালুকি হাওরে মৎস্য অভয়াশ্রম নির্মাণ করার পর থেকে অনেক বিলুপ্ত প্রজাতির মাছ আবার নতুন করে তাদের বংশ বিস্তার করতে শুরু করেছে। রানি মাছও এই তালিকায় রয়েছে। মৎস্যজীবি আহাদ আলী, ইব্রাহিম আলী, জাকির হোসেন জানান, আগে রানি মাছ পাওয়াই যেত না। দু’একটার দেখা মিলতো মাঝে মাঝে। কিন্তু গত কয়েক বছর থেকে মাছটির সংখ্যা বাড়ছে। আগের তুলনায় বেশি পাওয়া যাচ্ছে।
রানি মাছ কিনতে হলে তাদের আগে জানাতে হয়। তারপর এক কেজি মাছ ধরতে ৩-৪ দিন সময় লাগে। আবার একাধিক জেলেকে বলে রাখলে ২-৩ দিনে কেজি রানি মাছ দেয়া সম্ভব। এক কেজি মাছের মূল্য সর্বনিম্ন ১ হাজার টাকা। আগে দেশীয় প্রজাতির বিভিন্ন মাছের সঙ্গে রানি মাছও প্রচুর পরিমাণে ধরা পড়ত। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হাওরের জেলেরা এই মাছটির দেখা প্রায় পাচ্ছেন না। এতে রানি মাছ বিলুপ্তির পথে রয়েছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় জেলেরা জানান, প্রতি বছর আষাঢ়ের মাঝামাঝি সময় থেকে কার্তিক মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত হাওর ও আশপাশের জলাশয়ে অন্যান্য মাছের পাশাপাশি রানি মাছও ধরা পড়ত। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে এই মাছের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে।
হাওর, নদ-নদী, খাল-বিল, ঝিলে বিভিন্ন জাতের মাছ ধরা পড়লেও দেশীয় প্রজাতির রানি মাছের দেখা পাওয়া যাচ্ছে না ইদানিং। মৎস্য ব্যবসায়ী ও মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে বেপরোয়াভাবে অতিরিক্ত হারে মাছ ধরার ফলেই ছোট ছোট প্রজাতির এসব মাছ চিরতরে হারিয়ে যাচ্ছে।
সরেজমিনে হাকালুকি হাওরে গিয়ে জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সরকার ও মৎস্য বিভাগের পক্ষ থেকে এ প্রজাতির মাছ রক্ষায় কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। যার ফলে রানি মাছের বংশ বিস্তার ব্যাহত হচ্ছে। তারা জানান, এখনই উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে হয়তো মাছটি একেবারেই হারিয়ে যাবে।
কুলাউড়া উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবু মাসুদ বলেন, রানি মাছ বিলুপ্ত প্রজাতির তালিকায় ছিল। কিন্তু হাকালুকি হাওরে কয়েকটি অভয়াশ্রম বাস্তবায়নের ফলে এ মাছ আবার জেলেদের জালে ধরা পড়ছে। হাওরে মৎস্য অভয়াশ্রমের সংখ্যা বাড়ালে মাছের উৎপাদন বাড়বে। তাছাড়া হাওর এলাকার মানুষের মাছের চাহিদা মিটিয়ে গোটা দেশে সরবরাহ করা যাবে। এমনকি বিদেশেও রপ্তানি করা সম্ভব।
জুড়ী উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো: মনিরুজ্জামান জানান, হাকালুকি হাওরসহ আশপাশের বিল ও জলাশয় থেকে ইতোমধ্যে ২৩ প্রজাতির দেশীয় মাছ বিলুপ্তির পথে। এগুলোর মধ্যে রানি মাছও রয়েছে। বংশ রক্ষায় কোনো প্রকল্প না থাকায় নতুন প্রজন্ম এসব মাছ চিনতেই পারছে না।
এনএনবাংলা/
