ফ্লাইদুবাইয়ের ককপিটের ভেতরের সেই ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা জানালেন স্মিত মচ্ছার

দুবাই থেকে তেল আবিবগামী ফ্লাইদুবাইয়ের একটি ফ্লাইটে ককপিটে সহ-পাইলটের ছুরিকাঘাতের ঘটনায় আহত হয়েও জরুরি অবতরণ করে ১৭৪ যাত্রীর জীবন বাঁচিয়েছেন ভারতীয় ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছার। তার এই সাহসিকতার প্রশংসা করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিসহ বিশ্বের অনেক নেতা। সম্প্রতি এই ভারতীয় পাইলট ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর কাছে সেই ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন।
ক্যাপ্টেন মাচ্ছার জানান, দুবাই থেকে তেল আবিবগামী ফ্লাইটটির যাত্রা অন্য সাধারণ দিনের মতোই স্বাভাবিক ছিল। আকাশে ওড়ার কিছুক্ষণ পর সহ-পাইলট প্রার্থনা করার কথা বললে তিনি সৌজন্যবশত মুখ ঘুরিয়ে সামনের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। কিন্তু চার-পাঁচ মিনিট পরই হঠাৎ মাথার পেছনে প্রচণ্ড একটি আঘাত অনুভব করেন তিনি। প্রথম আঘাতের পর মাচ্ছার ভেবেছিলেন বিমানে হয়তো কোনো বড় ধরনের যান্ত্রিক ত্রুটি ঘটেছে। কিন্তু পরপর আরো একাধিক আঘাত আসতে থাকলে তিনি বুঝতে পারেন সমস্যা বিমানে নয়, ককপিটে থাকা অন্য মানুষটিই তাকে মারছে। কুড়ালের আঘাতে তার মাথার পেছন ফেটে রক্তে ভেসে যায় এবং দৃষ্টিশক্তি প্রায় ঝাপসা হয়ে আসে। আঘাত সামলে সহ-পাইলটকে থামানোর চেষ্টা করতেই তিনি অনুভব করেন বিমানটি প্রচণ্ড গতিতে নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে (৩৪,০০০ ফুট থেকে একপর্যায়ে বিমানটি ১৭,০০০ ফুটের নিচে চলে আসে)।
তিনি আরও বলেন, ‘শরীর থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরোচ্ছিল, প্রচণ্ড যন্ত্রণা হচ্ছিল। কিন্তু তখন নিজের কথা ভাবার সুযোগ ছিল না। আমি আহত হয়েছিলাম, কিন্তু যাত্রীদের তো এ ভাবে মরতে দিতে পারি না। ককপিটের ভিতরের পরিস্থিতি তখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছিল। ফ্লাইটও হু হু করে নীচের দিকে নামছিল। সামনে অপেক্ষা করছিল ভয়াবহ পরিণতি । সেই মুহূর্তে আমি আমার জীবনের জন্য লড়ছিলাম। শরীরে এত আঘাত লেগেছিল যে, আমি মাটিতে লুটিয়ে পড়েছিলাম। চোখ বন্ধ থাকলেও ফ্লাইটের ভিতরে কী ঘটছে তা ভালোই বুঝতে পারছিলাম। বুঝতে পারছিলাম, ফ্লাইটটি দ্রুত নীচের দিকে নেমে যাচ্ছে। সেই একটা মুহূর্তে আমার উপলব্ধি হলো যে, আমি যদি কিছু না করি— তা হলে সব শেষ।
স্মিত বলেন ‘আমার মধ্যে লড়াই করার শেষ শক্তিটুকু বাকি ছিল। আমি জানতাম, এখন প্রতিরোধ না করলে আমরা সবাই মারা যাব।’ সব শক্তি এক করে তিনি ককপিটের দরজার দিকে এগিয়ে যান এবং সেটি লক খুলে উন্মুক্ত করে দেন। দরজা খোলামাত্রই বাইরে অপেক্ষায় থাকা কেবিন ক্রু ও ইসরায়েলি যাত্রীরা ককপিটে ঢুকে পড়েন এবং হামলাকারী সহ-পাইলটকে কাবু করেন। পরবর্তীতে বিমানটিকে সৌদি আরবের তাবুক বিমানবন্দরে নিরাপদে জরুরি অবতরণ করানো হয়।’
দুবাই-তেল আবিব ফ্লাইটের ক্যাপ্টেন মাচ্ছারের ওপর আক্রমণকারী সহ-পাইলটকে হামাম আল-হাম্মামি নামের একজন ওমানি নাগরিক হিসেবে শনাক্ত করেছে গণমাধ্যম। তিনি ককপিটে থাকা জরুরি কুড়াল (ক্র্যাশ অ্যাক্স) দিয়ে হামলা চালিয়ে বিমানটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করেন, যাকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের অ্যাটর্নি জেনারেল হামাদ সাইফ আল শামসি একটি ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
স্মিত মাচ্ছার ( ৩৫) মুম্বাইয়ের ঘাটকোপারের বাসিন্দা। ক্যাপ্টেন মাচ্ছার প্রায় চার বছর ধরে ফ্লাইদুবাইয়ে কাজ করছেন। এর আগে স্পাইসজেটে প্রায় ১১ বছর দায়িত্ব পালন করেন। বোয়িং ৭৩৭-এ তার ১৩ বছরের বেশি বাণিজ্যিক উড্ডয়ন অভিজ্ঞতা এবং প্রায় ৯ হাজার ৭৫০ ঘণ্টা ফ্লাইট আওয়ার রয়েছে।
এনএনবাংলা/এফএস
