




জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যাসহ আটটি অভিযোগে দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনুকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। রায় ঘোষণার সময় তিনি আদালতের কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন।
মঙ্গলবার (৩০ জুন) দুপুর আড়াইটার দিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ রায় ঘোষণা করেন। প্যানেলের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ এবং বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
এর আগে দুপুর ১টা ৪২ মিনিটে ইনুকে হাজতখানা থেকে ট্রাইব্যুনালের এজলাসে এনে কাঠগড়ায় তোলা হয়। প্রায় ১০ মিনিট পর ২১১ পৃষ্ঠার রায় পাঠ শুরু হয়। বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর ইনুর বিরুদ্ধে আনা আটটি অভিযোগ পাঠ করেন এবং বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ সাক্ষ্য-প্রমাণ ও সাক্ষীদের বিভিন্ন বক্তব্য তুলে ধরেন। রায় ঘোষণার পুরো কার্যক্রম বাংলাদেশ টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।
প্রসিকিউশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৫ মার্চ হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। দীর্ঘ তদন্ত শেষে একই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর চিফ প্রসিকিউটরের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। পরে প্রতিবেদন পর্যালোচনা শেষে ২৫ সেপ্টেম্বর ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) দাখিল করে প্রসিকিউশন। একই দিন অভিযোগ আমলে নিয়ে ইনুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন ট্রাইব্যুনাল-২।
পরবর্তীতে উভয় পক্ষের দীর্ঘ শুনানি শেষে ২ নভেম্বর ইনুর বিরুদ্ধে আটটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর নির্দেশ দেন আদালত।
গত বছরের ৩০ নভেম্বর মামলায় প্রসিকিউশনের সূচনা বক্তব্য উপস্থাপনের মাধ্যমে বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয়। ১ ডিসেম্বর সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। তদন্ত কর্মকর্তাসহ মোট ১০ জন সাক্ষী প্রসিকিউশনের পক্ষে সাক্ষ্য দেন। অন্যদিকে আসামিপক্ষে সাফাই সাক্ষ্য দেন দুইজন। সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে চলতি বছরের ২ এপ্রিল থেকে যুক্তিতর্ক শুরু হয়। প্রথমে আসামিপক্ষ এবং পরে প্রসিকিউশন তাদের যুক্তি উপস্থাপন করে। ১৪ মে যুক্তিতর্ক শেষ হলে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয়। পরে ২২ জুন রায় ঘোষণার দিন নির্ধারণ করা হয় এবং সেই ধারাবাহিকতায় ৩০ জুন রায় ঘোষণা করেন ট্রাইব্যুনাল।
মামলাটিতে মোট ১০ জন সাক্ষী জবানবন্দি দেন। এর মধ্যে ছিলেন তিনজন চাক্ষুষ সাক্ষী, দুজন বিশেষজ্ঞ সাক্ষী, একজন ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্য, দুজন জব্দতালিকা সাক্ষী, একজন জেলার সাক্ষী এবং একজন তদন্ত কর্মকর্তা। এছাড়া আদালতে ২০ সিরিজের ডকুমেন্ট ও পাঁচটি বস্তু প্রদর্শনী উপস্থাপন করা হয়।
প্রসিকিউশনের আনা অভিযোগে বলা হয়, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই ভারতের মুম্বাইভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘মিরর নাউ’-এ দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আন্দোলনকারীদের বিএনপি-জামায়াত এবং সন্ত্রাসী-জঙ্গি হিসেবে আখ্যায়িত করে তাদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ বলপ্রয়োগের আহ্বান জানান হাসানুল হক ইনু।
এছাড়া ১৯ জুলাই গণভবনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ১৪ দলীয় জোটের বৈঠকে অংশ নিয়ে নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার বিরুদ্ধে ‘শ্যুট অ্যাট সাইট’ নির্দেশনা কার্যকরে ভূমিকা রাখেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়, ২০ জুলাই কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপারকে ফোন করে আন্দোলনকারীদের ছবি সংগ্রহ করে তালিকা তৈরির নির্দেশ দেন ইনু। তার নির্দেশনা অনুসরণ করে পুলিশ ও ১৪ দলীয় জোটের সশস্ত্র সদস্যরা ৫ আগস্ট পর্যন্ত কুষ্টিয়া শহরের বিভিন্ন স্থানে ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালায়। এতে শ্রমিক আশরাফুল ইসলাম, সুরুজ আলী বাবু, শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন, উসামা, ব্যবসায়ী বাবলু ফরাজী ও চাকরিজীবী ইউসুফ শেখ নিহত হন। আহত হন আরও বহু নিরীহ মানুষ।
প্রসিকিউশনের অভিযোগে আরও বলা হয়, জুলাই আন্দোলন দমনে মারণাস্ত্রের ব্যবহার, ছত্রীসেনা মোতায়েন, হেলিকপ্টার থেকে গুলি, বোমা হামলা, আটক ও নির্যাতনের পরিকল্পনাসহ বিভিন্ন পদক্ষেপে উসকানি দিয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে পরামর্শ দিতেন ইনু। একই সঙ্গে কারফিউ জারি এবং প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে সংঘটিত হত্যা ও নির্যাতনের ঘটনাগুলোকে সমর্থন করেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
এছাড়া ২৯ জুলাই শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আরেকটি ১৪ দলীয় বৈঠকেও তিনি অংশ নেন এবং সেখানে জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব দেন। প্রসিকিউশনের দাবি, এর মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও ১৪ দলীয় জোটের সশস্ত্র সদস্যদের অভিযান এবং নির্যাতনকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
অভিযোগে আরও বলা হয়, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের একদিন আগে, অর্থাৎ ৪ আগস্ট কারফিউ জারি এবং ছাত্র-জনতার বিরুদ্ধে গুলি চালানোর মতো পদক্ষেপেও সমর্থন ও অনুমোদন দেন হাসানুল হক ইনু।
এনএনবাংলা/
Tags: ১০ বছরকারাদণ্ডহাসানুল হক ইনু
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন