১৮ উইকেটে ম্যাকাই টেস্টের রোমাঞ্চকর প্রথম দিন

ম্যাকাই টেস্টের প্রথম দিনটি বাংলাদেশের জন্য শুরু হয়েছিল দুঃস্বপ্ন দিয়ে, শেষ হয়েছে দারুণ লড়াইয়ের সম্ভাবনা জাগিয়ে। মিচেল স্টার্কের বিধ্বংসী বোলিংয়ে মাত্র ৬৪ রানে অলআউট হয়ে যায় বাংলাদেশ। তবে দিনের শেষ ভাগে বল হাতে দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন করেছে সফরকারীরা। শরিফুল ইসলামের ছয় উইকেটের ঝড়ে অস্ট্রেলিয়াও দিন শেষ করেছে ৮ উইকেটে ১৬৫ রানে।
ফলে প্রথম দিনেই দুই দলের ১৮ উইকেটের পতন হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে গত ৫১ বছরে প্রথম দিনে তৃতীয় সর্বোচ্চ উইকেট পড়ার রেকর্ডও এটি। দিন শেষে অস্ট্রেলিয়ার লিড ১০১ রান।
অস্ট্রেলিয়ার হয়ে এখনো লড়াই করছেন ক্যামেরন গ্রিন। ৮১ বলে ৫১ রানে অপরাজিত এই অলরাউন্ডারের সঙ্গে ১০ রানে অপরাজিত আছেন নাথান লায়ন।
স্টার্কের তাণ্ডবে মাত্র ১২ রানে ৫ উইকেট
টস জিতে বাংলাদেশকে ব্যাটিংয়ে পাঠানোর সিদ্ধান্তের যথার্থতা শুরুতেই প্রমাণ করেন অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক প্যাট কামিন্স। ইনিংসের প্রথম বলেই সাদমান ইসলামকে ফেরান মিচেল স্টার্ক। ব্যাটের কানায় লেগে স্লিপে ক্যামেরন গ্রিনের হাতে চলে যায় বল। গোল্ডেন ডাক নিয়ে ফেরেন বাংলাদেশের ওপেনার।
পরের ওভারেই ডারউইন টেস্টের সেঞ্চুরিয়ান তানজিদ হাসান তামিমকেও শূন্য রানে ফেরান স্টার্ক। এরপর নাজমুল হোসেন শান্তও টিকতে পারেননি। লেগ স্টাম্পের দিকে বেরিয়ে যাওয়া বলে প্যাডে আঘাত হানলে আম্পায়ার তাকে আউট দেন। রিভিউ নিয়েও বাঁচতে পারেননি বাংলাদেশ অধিনায়ক। আম্পায়ার্স কলের কারণে বহাল থাকে সিদ্ধান্ত।
১৬ বলে ৯ রান করে স্টার্কের তৃতীয় শিকার হন মুমিনুল হক। লিটন দাসকে প্রথমবার স্লিপে ক্যাচ দিয়েও জীবন পান তিনি। কিন্তু পরের বলেই এলবিডব্লিউ হয়ে ফেরেন। রিভিউ নিয়ে সফল হয় অস্ট্রেলিয়া।
মাত্র ১২ রানেই ৫ উইকেট হারিয়ে ভয়াবহ বিপর্যয়ে পড়ে বাংলাদেশ।
মুশফিক-মিরাজের চেষ্টা, শেষ পর্যন্ত ৬৪ রানে অলআউট
বিপর্যয় সামলানোর চেষ্টা করেন মুশফিকুর রহিম ও মেহেদী হাসান মিরাজ। তবে প্যাট কামিন্সের ভেতরে ঢুকে আসা বলে ব্যাট-প্যাডের ফাঁক গলে বোল্ড হন মুশফিক। ৪২ বলে করেন ৫ রান।
লাঞ্চের আগে আর কোনো উইকেট না হারিয়ে ৬ উইকেটে ৩৫ রান নিয়ে বিরতিতে যায় বাংলাদেশ। বিরতির পর দ্রুতই ফেরেন মিরাজ ও হাসান মাহমুদ। কামিন্সের বলে স্লিপে ক্যাচ দিয়ে ৫১ বলে ১১ রান করেন মিরাজ। এরপর হ্যাজলউডের বলে নাথান লায়নের হাতে ক্যাচ দেন হাসান মাহমুদ। তার ব্যাট থেকে আসে ৩৬ বলে ১০ রান।
বাংলাদেশ তখন ৮ উইকেটে ৩৮ রানে। আশঙ্কা তৈরি হয়, ২০১৮ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে করা ৪৩ রানের সর্বনিম্ন টেস্ট স্কোরও এবার ছাড়িয়ে যেতে পারে দলটি।
শেষ পর্যন্ত সেই লজ্জা এড়ায় বাংলাদেশ। তাইজুল ইসলাম ও শরিফুল ইসলাম দশম উইকেটে ২৫ রান যোগ করেন, যা হয়ে ওঠে ইনিংসের সর্বোচ্চ জুটি। ১৯ বলে ১৪ রান করে ফেরেন শরিফুল। তাইজুল ২৬ বলে ১১ রানে অপরাজিত থাকেন।

৩৪ ওভারে ৬৪ রানে শেষ হয় বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস।
স্টার্ক ১০ ওভারে ৬ মেডেনসহ মাত্র ১২ রান দিয়ে নেন ৬ উইকেট। প্যাট কামিন্সের শিকার ৩টি এবং জশ হ্যাজলউড নেন একটি উইকেট।
তাসকিন-শরিফুলের আঘাতে অস্ট্রেলিয়াতেও ধস
বাংলাদেশের ৬৪ রানের জবাবে ব্যাটিংয়ে নেমেও স্বস্তিতে থাকতে পারেনি অস্ট্রেলিয়া। তৃতীয় ওভারে ম্যাট রেনশকে ফিরিয়ে প্রথম সাফল্য এনে দেন তাসকিন আহমেদ। তিন বছরের বেশি সময় পর টেস্টে ফিরে ১০ বলে ৮ রান করেন রেনশ।
এরপর আঘাত হানেন শরিফুল ইসলাম। ট্রাভিস হেডকে ২২ রানে বোল্ড করে প্রথম সাফল্য পান বাঁহাতি এই পেসার। একই ওভারে মার্নাস লাবুশেনকেও বোল্ড করে অস্ট্রেলিয়ার টপ অর্ডারে বড় ধস নামান তিনি। ৯ বলে ৪ রান করেন লাবুশেন।
চা বিরতিতে ৩ উইকেটে ৫০ রান নিয়ে যায় অস্ট্রেলিয়া। এরপর স্টিভেন স্মিথ ও ক্যামেরন গ্রিন মিলে চতুর্থ উইকেটে ৭৭ রানের জুটি গড়ে প্রতিরোধ তৈরি করেন। তবে নতুন স্পেলে ফিরে সেই জুটি ভেঙে দেন শরিফুল।
৭৪ বলে ৪২ রান করে এলবিডব্লিউ হন স্মিথ। পরের দিকে অ্যালেক্স ক্যারিকে নিজের প্রথম ওভারেই ফেরান মেহেদী হাসান মিরাজ। ৮ বলে ৫ রান করে সাজঘরে ফেরেন অস্ট্রেলিয়ান উইকেটরক্ষক।
শরিফুলের ঝড়ে অস্ট্রেলিয়ার শেষ ছয় উইকেটের চারটি
এরপর যেন একক আধিপত্য বিস্তার করেন শরিফুল। নতুন স্পেলে ফিরে ৩২তম ওভারের প্রথম বলেই ওয়েবস্টারকে এলবিডব্লিউ করেন তিনি। রিভিউ নিয়েও বাঁচতে পারেননি ওয়েবস্টার।
ওভারের পঞ্চম বলে শর্ট ডেলিভারিতে প্যাট কামিন্সকে চমকে দেন শরিফুল। বল গ্লাভসে লেগে উঠে গেলে লিটন দাস সহজেই ক্যাচ নেন। রানের খাতা খোলার আগেই ফেরেন অস্ট্রেলিয়া অধিনায়ক। এর মধ্য দিয়ে টেস্ট ক্যারিয়ারের প্রথম পাঁচ উইকেট পূর্ণ করেন শরিফুল।
পরের ওভারেই মিচেল স্টার্ককে বোল্ড করে নিজের শিকার সংখ্যা ছয়ে নিয়ে যান তিনি। অফ স্টাম্পের ওপরের ডেলিভারি পিচে পড়ে সোজা হয়ে স্টার্কের স্টাম্প উড়িয়ে দেয়। ৬ বলে ১ রান করে ফেরেন স্টার্ক।
শেষ পর্যন্ত ৮ উইকেটে ১৬৫ রান নিয়ে দিন শেষ করে অস্ট্রেলিয়া। শরিফুলের ছয় উইকেটের পাশাপাশি তাসকিন ও মিরাজ নেন একটি করে উইকেট।

প্রথম দিনেই একাধিক রেকর্ড
ম্যাকাইয়ের গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ অ্যারেনায় এটিই প্রথম টেস্ট। আর সেই টেস্টের প্রথম বলেই উইকেট নিয়ে মাঠটির ইতিহাসে প্রথম উইকেটশিকারি হয়ে যান মিচেল স্টার্ক। একই সঙ্গে প্রথম বলেই আউট হওয়া ব্যাটার হিসেবে রেকর্ডে নাম ওঠে সাদমান ইসলামের।
স্টার্ক গড়েছেন আরও একটি বড় কীর্তি। মাত্র ২২ বলে পাঁচ উইকেট নিয়ে বাংলাদেশের বিপক্ষে টেস্টে সবচেয়ে কম বলে ফাইফার নেওয়ার রেকর্ড গড়েছেন তিনি। সব মিলিয়ে টেস্টে এটি তার ১৯তম পাঁচ উইকেটের ইনিংস।
দিনের শেষ ভাগে অবশ্য সব আলো কেড়ে নেন শরিফুল ইসলাম। প্রথম ইনিংসে দলের সর্বোচ্চ ১৪ রান করার পর বল হাতে ছয় উইকেট নিয়ে বাংলাদেশকে ম্যাচে ফিরিয়ে এনেছেন তিনি।
একই ম্যাচে ১১ নম্বরে ব্যাট করতে নেমে দলের সর্বোচ্চ রান এবং বল হাতে পাঁচ বা তার বেশি উইকেট নেওয়ার অনন্য কীর্তিও গড়েছেন শরিফুল। টেস্ট ইতিহাসে এমন কীর্তি আর কোনো ক্রিকেটারের নেই।
১০১ রানে পিছিয়ে বাংলাদেশ, ম্যাচ এখনো জমজমাট
প্রথম দিন শেষে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি অস্ট্রেলিয়ার হাতে নেই। ১০১ রানে পিছিয়ে থাকলেও বাংলাদেশের সামনে এখন অস্ট্রেলিয়ার বাকি দুই উইকেট দ্রুত তুলে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। গ্রিনকে দ্রুত ফেরাতে পারলে অস্ট্রেলিয়ার লিডও সীমিত রাখা সম্ভব হবে।
ম্যাকাই টেস্টের প্রথম দিন তাই একদিকে স্টার্কের বিধ্বংসী বোলিং, অন্যদিকে শরিফুল ইসলামের দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তনের গল্প হয়ে থাকল। দ্বিতীয় দিনে কোন দল কতটা এগিয়ে যায়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
এনএনবাংলা/

