দেশজুড়ে লোডশেডিং, গরমে নাজেহাল জনজীবন

প্রচণ্ড গরমের মধ্যে দেশে আবারও নাজুক হয়ে উঠেছে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নিয়মিত বিদ্যুৎ না থাকায় ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ার পাশাপাশি জ্বালানি সংকটও পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উৎপাদন সক্ষমতা না বাড়ালে এ সংকট থেকে দ্রুত উত্তরণের সুযোগ নেই।
প্রতি বছর তীব্র গরমে বিদ্যুতের বাড়তি চাহিদা সামাল দিতে গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিং করে রাজধানী ও শিল্পাঞ্চলে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করা হয়। তবে এবার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকাতেও নিয়মিত লোডশেডিং হচ্ছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, দিনে কয়েকবার লোডশেডিং সইতে হচ্ছে নগরবাসীকে। বাড্ডা, খিলগাঁও, তেজগাঁও, মগবাজার, মোহাম্মদপুর ও শ্যামলীসহ বিভিন্ন এলাকায় দিনে ও রাতে একাধিকবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
বিদ্যুৎ বিতরণ সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে লোডশেডিংয়ের পরিমাণ আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। গড়ে প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ঘাটতি থাকায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না।
তীব্র গরমের মধ্যে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন গ্রাম ও মফস্বল এলাকার মানুষ। কোনো কোনো অঞ্চলে দিনের বড় একটি অংশ বিদ্যুৎহীন থাকছে। ফলে ঘুম, পড়াশোনা, ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র শিল্পের উৎপাদন—সব ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের প্রভাব পড়েছে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যেও। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় ফ্রিজ ও বৈদ্যুতিক যন্ত্রনির্ভর ব্যবসা পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি আইসক্রিম, কোমল পানীয়সহ বিভিন্ন ঠান্ডা ও দ্রুত নষ্ট হওয়া পণ্য সংরক্ষণে সমস্যায় পড়ছেন ব্যবসায়ীরা। ফলে পণ্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি বাড়ছে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ।
বিদ্যুৎ সংকটের কারণে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনাও ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে রাতে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় পরীক্ষার্থীদের প্রস্তুতিতে সমস্যা তৈরি হয়েছে।
প্রচণ্ড গরমের মধ্যে মোমবাতির আলোয় পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া অনেক শিক্ষার্থীর জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে।
লোডশেডিংয়ের কারণে সেচ পাম্পগুলো ঠিকমতো চালানো যাচ্ছে না। ফলে আবাদ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করছেন কৃষকরা।
কুয়াকাটার হোটেল-মোটেল ও রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ীরাও ক্ষতির মুখে পড়েছেন। দীর্ঘ সময় জেনারেটর চালাতে হওয়ায় খরচ বাড়ছে। বিদ্যুৎ সমস্যার কারণে অনেক পর্যটক বুকিং বাতিল করছেন বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
পিডিবির তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ আগস্ট রাত ১টায় দেশে লোডশেডিং হয়েছিল ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট, যা চলতি বছরের সর্বোচ্চ। এক মাস পর ১০ সেপ্টেম্বর লোডশেডিং হয়েছে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার মেগাওয়াট। ওই দিন একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আদানি পাওয়ারের সরবরাহও প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছিল।
পিডিবির তথ্য বলছে, চলতি বছর কোনো কোনো দিনে পিক আওয়ারে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ১৭ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছেছে। তবে এলএনজি সংকট, টার্মিনালে ত্রুটি, কয়লা ও তেলের ঘাটতি এবং আদানি পাওয়ারের সরবরাহ কমে যাওয়াসহ বিভিন্ন কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, প্রকৃত বিদ্যুতের চাহিদা সরকারি হিসাবের চেয়েও বেশি হতে পারে।
ইনস্টিটিউট ফর অ্যানার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিস (আইইইএফএ) এর প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলেমের মতে, বিদ্যুতের চাহিদা ইতোমধ্যে ১৯ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে। গ্রীষ্মকালও আগের তুলনায় দীর্ঘ হচ্ছে। সেপ্টেম্বরেও তীব্র গরম থাকায় বিদ্যুতের চাহিদা কমছে না। এর সঙ্গে জ্বালানির দামের অস্থিরতাসহ নানা বিষয় যুক্ত হয়েছে। ফলে পরিস্থিতি সামাল দিতে সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান সংকট মোকাবিলায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় ও সিস্টেম লস কমানোর পাশাপাশি আগামী বছরের জন্য বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা নিতে হবে। পাওয়ার সেলের সাবেক মহাপরিচালক বি. ডি. রহমতউল্লাহ বলেন, সরকারের বিদ্যুৎ খাতে কার্যকর পরিকল্পনার ঘাটতি রয়েছে। দ্রুত কম রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ে চালু করা সম্ভব এমন বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভবিষ্যতে সংকট এড়াতে দ্রুত নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প বাস্তবায়নের পাশাপাশি দেশের নিজস্ব গ্যাস উত্তোলন বাড়াতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি বাড়তি চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে এখন থেকেই বিদ্যুৎ উৎপাদন ও জ্বালানি সরবরাহের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
এনএনবাংলা/এফএস
