Skip to content

Upcoming
Spain
0-0
Saudi Arabia
Source: ESPN

খুলনা জেলা পরিষদে অনিয়ম–দুর্নীতির অভিযোগ সাবেক প্রশাসক হুসাইন শওকতের বিরুদ্ধে তদন্ত দাবি নাগরিক সমাজের

খুলনা ব্যুরো:

খুলনা জেলা পরিষদের সাবেক প্রশাসক ও খুলনা বিভাগের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (সার্বিক) মো. হুসাইন শওকতের বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই জেলা পরিষদে নিয়মবহির্ভূত প্রকল্প বাস্তবায়ন, অননুমোদিত ব্যয় এবং সরকারি তহবিল আত্মসাতের একাধিক ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, কর্মকর্তা ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা।

স্থানীয়দের দাবি, আত্মীয়তা ও প্রভাব খাটিয়ে হুসাইন শওকত খুলনায় একটি “স্বার্থের সাম্রাজ্য” গড়ে তুলেছিলেন। এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত ও তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন খুলনার সাধারণ নাগরিকরা।

জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার জেলা পরিষদগুলোতে প্রশাসক নিয়োগ দেয়। সেই ধারাবাহিকতায় বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের ২৪তম ব্যাচের কর্মকর্তা মো. হুসাইন শওকত খুলনা জেলা পরিষদের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

সূত্র জানায়, এর আগে একটি গোয়েন্দা সংস্থার নেতিবাচক প্রতিবেদনের কারণে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও তিনি যুগ্মসচিব পদে পদোন্নতি পাননি।

অভিযোগ অনুযায়ী, প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি জেলা পরিষদের সভা বা স্থানীয় সরকার বিভাগের অনুমোদন ছাড়াই একাধিক প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করেন। এসব প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে, পরিষদ ভবনের দ্বিতীয় তলা সংস্কার: ২৫ লাখ টাকা, আসবাবপত্র সরবরাহ: ১৫ লাখ টাকা, বিভিন্ন সরঞ্জাম ক্রয়: ১২ লাখ টাকা।

স্থানীয় সরকার বিভাগের বিধি অনুযায়ী, এক লাখ টাকার বেশি মূল্যের যেকোনো প্রকল্পে পরিষদ সভা ও মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন বাধ্যতামূলক। কিন্তু সে বিধি উপেক্ষা করে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করা হয়েছে বলে অভিযোগ।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, টেন্ডার প্রক্রিয়া এড়িয়ে প্রাক্কলন পরিবর্তনের মাধ্যমে কাজগুলো করা হয়েছে, যা পুরোপুরি নিয়মবহির্ভূত।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে টেন্ডার হওয়া প্রকল্পগুলো নতুন সরকারের অনুমোদন ছাড়াই বাস্তবায়ন করেন হুসাইন শওকত। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য, জেলা পরিষদের সম্মেলনকক্ষ আধুনিকায়ন ৩০ লাখ টাকা, ভবনের নিচতলার বাউন্ডারি ওয়াল সংস্কার ৩৬ লাখ টাকা।

২০২৪ সালের ১ অক্টোবর স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়, আগের সরকারের অনুমোদিত প্রকল্প পরিবর্তন করে নতুন করে অনুমোদন নিতে হবে। কিন্তু সেই নির্দেশনা উপেক্ষা করে পুরোনো ঠিকাদারদের দিয়েই কাজ করানো হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ক্ষেত্রে ঠিকাদারদের কাছ থেকে অনৈতিক আর্থিক সুবিধা নেওয়ার কথাও বলা হচ্ছে

২০২৪–২৫ অর্থবছরে জেলা পরিষদের কর্মকর্তা–কর্মচারীদের কল্যাণ, শিক্ষা ও চিকিৎসা খাতে ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ ছিল। অভিযোগ রয়েছে, এই অর্থ ‘মনগড়া বণ্টনের মাধ্যমে’ আত্মসাৎ করা হয়েছে।

বিধি অনুযায়ী, চিকিৎসা সহায়তায় সর্বোচ্চ ৩০ হাজার টাকা, শিক্ষা সহায়তায় সর্বোচ্চ ৮ হাজার টাকা।

কিন্তু বাস্তবে একাধিক ব্যক্তিকে ৬০ হাজার থেকে শুরু করে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া এসব অনুদান পাইয়ে দেওয়ার নামে প্রায় ১০ লাখ টাকা ঘুষ আদায়ের কথাও উঠে এসেছে।

এক কর্মকর্তা বলেন, কল্যাণ তহবিলের টাকা পেতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছ থেকেও অর্থ আদায় করা হয়েছে। প্রকৃত অসুস্থ ও দরিদ্র কর্মচারীরা বঞ্চিত হয়েছেন।

জেলা পরিষদের বাজেটে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সহায়তায় ১ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, এই অর্থের বড় অংশ গিয়েছে বিভিন্ন প্রভাবশালী সংগঠন ও অভিজাত ফোরামের হাতে। শত শত দরিদ্র আবেদনকারী সহায়তা না পেয়ে ফিরেছেন, এমনকি বছরের শেষে বড় অঙ্কের বরাদ্দ ল্যাপস হয়ে গেছে।

এক জনপ্রতিনিধি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দরিদ্র মানুষ আবেদন করেও সহায়তা পায়নি। অথচ প্রভাবশালীরা অনুদান নিয়ে গেছে।

সূত্র জানায়, অনিয়মের লাগাম টানতে নোট উপস্থাপন করায় জেলা পরিষদের এক প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়, যাতে অনিয়মের পথ আরও সহজ হয়।

আরেকটি গুরুতর অভিযোগ হলো, এক বছরে হুসাইন শওকত মাত্র ১০ দিন অফিস করেছেন। অধিকাংশ নথি, বিল, চেক ও রেজিস্টারে স্বাক্ষরের জন্য খুলনা বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে নেওয়া হতো। যা প্রশাসনিক ও নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকির সৃষ্টি করেছে।

তিনি কোনো প্রকল্প সরাসরি পরিদর্শন করেননি বলেও অভিযোগ রয়েছে। এমনকি খুলনা শহরে প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন অডিটোরিয়াম কাম মাল্টিপারপাস হলও একবার ঘুরে দেখেননি।

এক কর্মকর্তা বলেন, তার অনুপস্থিতির কারণে প্রকল্প অনুমোদন, বিল ছাড় ও দৈনন্দিন কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, খুলনা ওয়াসাসহ বিভিন্ন সংস্থায় দায়িত্ব পালনকালে অনিয়ম করেছেন তিনি। খুলনা শহরের পশ্চিম বানিয়া খামার এলাকায় শ্বশুরবাড়ির পাশে একটি বিলাসবহুল অট্টালিকা নির্মাণ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে স্থানীয় সুশীল সমাজ ও নাগরিক প্রতিনিধিরা নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন এবং তাকে প্রশাসকের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতির দাবি জানিয়েছেন।

স্থানীয় নাগরিকরা বলেন,তিনি সরকারি আর্থিক বিধি ও নৈতিক দায়িত্ব লঙ্ঘন করেছেন। তার কর্মকাণ্ডে প্রশাসনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়েছে।

তাদের মতে, খুলনা জেলা পরিষদের এই অভিযোগগুলো শুধু স্থানীয় প্রশাসনের নয়, অন্তর্বর্তী সরকারের জবাবদিহিতারও একটি বড় পরীক্ষা। নিরপেক্ষ তদন্ত হলে শুধু খুলনা নয়, দেশের অন্যান্য জেলা পরিষদের অজানা অনিয়মও সামনে আসতে পারে।