ওয়েজ বোর্ড বাস্তবায়ন ও ডিআরইউকে স্বাবলম্বী করার দাবি চিফ রিপোর্টারদের

সাংবাদিকদের পেশাগত মানোন্নয়ন, ওয়েজ বোর্ড বাস্তবায়ন এবং ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ)-কে আরও শক্তিশালী, আধুনিক ও স্বাবলম্বী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের দাবি জানিয়েছেন দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমের চিফ রিপোর্টাররা। রোববার (১৯ জুলাই) দুপুরে ডিআরইউর শফিকুল কবির মিলনায়তনে জাতীয় দৈনিক, সংবাদ সংস্থা ও অনলাইন গণমাধ্যমের চিফ রিপোর্টারদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় এসব দাবি ওঠে।
সভায় সভাপতিত্ব করেন ডিআরইউ সভাপতি আবু সালেহ আকন, সঞ্চালনায় ছিলেন সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেল।
নবম ওয়েজ বোর্ড নিয়ে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ
মুক্ত আলোচনায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় সাংবাদিকদের বেতন কাঠামোর প্রশ্ন। দৈনিক আমার দেশ-এর এম আবদুল্লাহ সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতন স্কেলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সাংবাদিকদের বেতন কাঠামো জরুরি ভিত্তিতে নির্ধারণ ও বাস্তবায়নের দাবি জানান। তিনি ডিআরইউসহ সাংবাদিক সংগঠনগুলোকে এ নিয়ে জোরালো আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ২০১৩ সালের পর সাংবাদিকদের বেতন বাড়েনি এবং নবম ওয়েজ বোর্ডও এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের মাধ্যমে অবসরভাতা ও বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
রাইজিংবিডি-এর নইমুদ্দিন প্রিন্ট, অনলাইন ও টেলিভিশন — এই তিন মাধ্যমের সাংবাদিকদের জন্য অভিন্ন ওয়েজ বোর্ড বাস্তবায়নের দাবি তোলেন।
প্রসঙ্গত, খোদ সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনও সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, নবম ওয়েজ বোর্ড বাস্তবায়ন ছাড়া সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা ও সম্মানজনক বেতন-ভাতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এর আগে গত বছর ডিআরইউ নেতৃত্বও নবম ওয়েজ বোর্ড রোয়েদাদ বাস্তবায়ন ও দশম ওয়েজ বোর্ড গঠনের দাবিতে বিবৃতি দিয়েছিল, পাশাপাশি তারা সাপ্তাহিক দুই দিন ছুটি কার্যকরেরও দাবি জানিয়ে আসছে — যে দাবির প্রতিধ্বনি রোববারের সভাতেও শোনা গেছে আজকের পত্রিকা-এর শহীদুল ইসলাম খানের বক্তব্যে।
রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও আধুনিক ডিআরইউর আহ্বান
ডিআরইউর সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সমকাল-এর মসিউর রহমান খান সংগঠনটিকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রেখে পরিচালনার আহ্বান জানান। বাসস (ইংরেজি)-এর রাজিব হোসেন ডিআরইউর অরাজনৈতিক ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ণ রাখার ওপর জোর দেন। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর আবুল কাশেম সাংবাদিকদের মর্যাদা রক্ষায় ডিআরইউকে আরও বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখার পাশাপাশি সরকারি অনুদান আদায়ে উদ্যোগী হওয়ার পরামর্শ দেন।
প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নে জোর
বেশ কয়েকজন চিফ রিপোর্টার তরুণ সাংবাদিকদের দক্ষতা উন্নয়নে নিয়মিত ও বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তার কথা তোলেন। বাসস-এর দিদারুল আলম নিয়মিত প্রশিক্ষণের আহ্বান জানান, আর মানবজমিন-এর লুৎফর রহমান বলেন, সংবাদের গুণগত মান উন্নয়নে ধারাবাহিক ও বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের কোনো বিকল্প নেই। কালের কণ্ঠ-এর শরিফুল আলম সুমন প্রতি বছর এ ধরনের মতবিনিময় সভা আয়োজনের প্রস্তাব দেন। সময়ের আলো-এর মামুন হোসেন সদস্যদের মধ্যে ফেলোশিপ চালু ও বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠনের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন।
এআই ও প্রযুক্তিনির্ভর সাংবাদিকতায় জোর
সভায় সময়ের চাহিদা অনুযায়ী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও প্রযুক্তিনির্ভর সাংবাদিকতায় দক্ষ জনবল গড়ে তোলার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়। সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেল জানান, বর্তমান কমিটি শুধু সাংগঠনিক কার্যক্রমেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও বাস্তবায়ন করছে। এর অংশ হিসেবে ডিআরইউ প্রাঙ্গণে আধুনিক মসজিদ কমপ্লেক্স, সদস্যদের জন্য হেলথ কর্নার, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি ট্রেনিং ইনস্টিটিউট গড়ে তোলা এবং সংগঠনের স্থায়ী আয়ের উৎস তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। এআই, ডেটা জার্নালিজম, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা, মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টিং ও ডিজিটাল নিরাপত্তা বিষয়ে দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে নিয়মিত প্রশিক্ষণেরও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
ডিআরইউর তথ্যপ্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণ সম্পাদক মাহমুদ সোহেল জানান, খুব শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি ট্রেনিং ইনস্টিটিউট, যেখানে সদস্যদের পাশাপাশি তাদের সন্তানদের জন্যও ইংরেজি ভাষা, অ্যাবাকাস, চীনা ভাষা, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ বিভিন্ন দক্ষতাভিত্তিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকবে।
সভাপতির বক্তব্যে আবু সালেহ আকন বলেন, সাংবাদিকদের অধিকার আদায়, পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং সংগঠনের মর্যাদা সমুন্নত রাখতে ডিআরইউ অতীতের মতো ভবিষ্যতেও অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে। তিনি বলেন, বর্তমান সময়ে সাংবাদিকতা নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি — পেশাগত অনিশ্চয়তা, নিরাপত্তাহীনতা, নিম্ন বেতন, হামলা-মামলা ও সামাজিক নিরাপত্তার অভাব সাংবাদিকদের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়। এসব সমস্যা সমাধানে ডিআরইউ সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করছে বলেও জানান তিনি।
সভায় ডিআরইউ কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-সভাপতি মেহ্দী আজাদ মাসুম, যুগ্ম সম্পাদক মো. জাফর ইকবাল, অর্থ সম্পাদক নিয়াজ মাহমুদ সোহেল, সাংগঠনিক সম্পাদক এম এম জসিম, দপ্তর সম্পাদক রাশিম মোল্লা, নারী বিষয়ক সম্পাদক জান্নাতুল ফেরদৌস পান্না, ক্রীড়া সম্পাদক ওমর ফারুক রুবেল, সাংস্কৃতিক সম্পাদক মো. মনোয়ার হোসেন, আপ্যায়ন সম্পাদক আমিনুল হক ভূঁইয়া, কল্যাণ সম্পাদক রফিক মৃধাসহ কার্যনির্বাহী সদস্য মাহফুজ সাদি, আল-আমিন আজাদ, মোহাম্মদ নঈমুদ্দীন ও সুমন চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন।
নবম ওয়েজ বোর্ড বাস্তবায়ন নিয়ে সাংবাদিক সংগঠনগুলোর এই দাবি নতুন নয় — দীর্ঘদিন ধরেই এ প্রশ্নে ক্ষোভ জমছে গণমাধ্যম কর্মীদের মধ্যে। রোববারের সভায় ওঠা প্রস্তাবগুলো ডিআরইউর সামনে এখন সেই পুরনো দাবিকে নতুন করে সরকারের দুয়ারে পৌঁছে দেওয়ার চ্যালেঞ্জ রেখে গেল।
