বাংলাদেশসহ ৬০ দেশের পণ্যে নতুন শুল্ক আরোপ যুক্তরাষ্ট্রের

জোরপূর্বক শ্রম (ফোর্সড লেবার) প্রতিরোধে যথাযথ ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগে বাংলাদেশসহ ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও আরও ৬০টি বাণিজ্যিক অংশীদার দেশের পণ্যের ওপর নতুন শুল্ক আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের এ সিদ্ধান্ত আজ শুক্রবার (২৪ জুলাই) থেকে কার্যকর হয়েছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন ব্যবস্থার আওতায় বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশের পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ এবং অন্য কিছু দেশের ক্ষেত্রে ১০ থেকে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। একই সময়ে বিশ্বব্যাপী আরোপ করা যুক্তরাষ্ট্রের অস্থায়ী ১০ শতাংশ শুল্কের মেয়াদও শেষ হচ্ছে।
হোয়াইট হাউসের ভাষ্য, ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বৈশ্বিক শুল্কব্যবস্থা পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। গত ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় জরুরি অবস্থা আইনের আওতায় আরোপিত ১০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত তথাকথিত ‘রেসিপ্রোকাল’ শুল্ক মার্কিন উচ্চ আদালত বাতিল করলেও এবার নতুন আইনি ভিত্তিতে শুল্ক আরোপ করা হয়েছে।
ফেডারেল রেজিস্টারে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, নতুন শুল্ক যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি হওয়া মোট পণ্যের প্রায় ৯৯ দশমিক ৪ শতাংশের ওপর প্রযোজ্য হবে। তবে জ্বালানি তেল ও গ্যাস, সার, কিছু খাদ্যপণ্যসহ কয়েকটি পণ্য এ শুল্কের বাইরে থাকবে।
এই শুল্ক ১৯৭৪ সালের ট্রেড অ্যাক্টের সেকশন ৩০১-এর আওতায় আরোপ করা হয়েছে। ফলে সুপ্রিম কোর্টের আগের রায়ের পরও যুক্তরাষ্ট্র কার্যত অধিকাংশ আমদানিকৃত পণ্যের ওপর ন্যূনতম শুল্ক বহাল রাখতে পারবে। একই সঙ্গে অতীতে সেকশন ৩০১ আদালতে টিকে থাকায় নতুন শুল্কের বিরুদ্ধে আইনি চ্যালেঞ্জও তুলনামূলক কঠিন হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার এক বিবৃতিতে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় এক শতাব্দী ধরে জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্য আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে এবং তা কঠোরভাবে কার্যকর করা হয়। এখন সময় এসেছে বাণিজ্যিক অংশীদার দেশগুলোও একই ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। তার মতে, নতুন পদক্ষেপ বিশ্বব্যাপী শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষা এবং অন্যায্য বাণিজ্যচর্চা মোকাবিলায় সহায়ক হবে।
এর আগে গ্রিয়ার জানিয়েছিলেন, যেসব দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য চুক্তিতে সর্বোচ্চ শুল্কহার নির্ধারিত রয়েছে, নতুন ‘ফোর্সড লেবার’ শুল্ক সেই সীমা অতিক্রম করবে না।
বাংলাদেশের ওপর ১০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বাংলাদেশ, আর্জেন্টিনা, ব্রিটেন, কানাডা, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, মেক্সিকো, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কাসহ মোট ১৮টি দেশের পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করা হয়েছে।
অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান ও সুইজারল্যান্ডের ক্ষেত্রে বিদ্যমান ‘মোস্ট-ফেভার্ড-নেশন’ (এমএফএন) শুল্কের সঙ্গে মিলিয়ে মোট শুল্কহার ১০ অথবা ১২ দশমিক ৫ শতাংশ হবে।
এছাড়া চীনসহ আরও ৩৮টি দেশের পণ্যের ওপর ১২ দশমিক ৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, চীনে উইঘুর সংখ্যালঘুদের জোরপূর্বক শ্রমে নিয়োজিত করা হয়। যদিও বেইজিং বরাবরই এ অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত নভেম্বরে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে হওয়া বাণিজ্য যুদ্ধবিরতির সময় যে ২০ শতাংশ শুল্কহারে সম্মতি হয়েছিল, সেটিই পুনর্বহাল থাকবে এবং এর বেশি বাড়ানো হবে না।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তদন্তের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত
মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি দপ্তর (ইউএসটিআর) জানিয়েছে, বাংলাদেশ-সংক্রান্ত তদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতেই ১০ শতাংশ শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে।
তদন্তে এগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড (এআরটি)-এর আওতায় জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের আমদানি নিষিদ্ধ করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বাধ্যবাধকতা, জনমত, সাক্ষ্য, সেকশন ৩০১ কমিটি এবং উপদেষ্টা কমিটিগুলোর মতামত বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
প্রেসিডেন্টের নির্দেশনা অনুযায়ী অ্যানেক্স-১ এবং অ্যানেক্স-২-এর পার্ট এ ও জে অংশে উল্লেখিত কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া বাংলাদেশের পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর করা হয়েছে।
ইউএসটিআর আরও জানিয়েছে, তদন্তে চিহ্নিত নীতি, কার্যকলাপ ও চর্চা দূর করতে নির্ধারিত শুল্কহার, শুল্কের আওতা এবং অব্যাহতিগুলো উপযুক্ত বলে বিবেচিত হয়েছে।
উল্লেখ্য, অ্যানেক্স-১ এবং অ্যানেক্স-২-এর পার্ট এ ও জে অংশে কোনো নির্দিষ্ট দেশের নাম নেই। সেখানে কেবল যেসব পণ্য ১০ শতাংশ শুল্ক থেকে অব্যাহতি পাবে, সেগুলোর এইচটিএসইউএস কোডভিত্তিক তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে।

বাংলাদেশের রপ্তানি খাত বড় অংশে পোশাকশিল্প নির্ভর। ছবি: সংগৃহীত
বিভিন্ন দেশের প্রতিবাদ
নতুন শুল্ক ঘোষণার পর কয়েকটি দেশ এর বিরোধিতা করেছে।
নরওয়ের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এসপেন বার্থ আইদে বলেন, জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের বাণিজ্য ঠেকাতে নরওয়ের আগে থেকেই সুস্পষ্ট নিয়ম রয়েছে। তাই তাদের বিরুদ্ধে এ শুল্ক আরোপের কোনো ভিত্তি নেই।
অস্ট্রেলিয়া ও ব্রাজিল শুল্ককে অযৌক্তিক আখ্যা দিয়ে তা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে। কানাডা একে ‘একতরফা’ পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
ম্যাসাচুসেটসের ডেমোক্র্যাট গভর্নর মওরা হিলি বলেন, এই শুল্ক ব্যবসার ব্যয় বাড়াবে, প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমাবে এবং এর বোঝা শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপরই পড়বে।
একই হার, ভিন্ন আইনি ভিত্তি
ওয়াশিংটনের আইন প্রতিষ্ঠান উইলি রেইনের বাণিজ্য আইনজীবী টিম ব্রাইটবিল বলেন, নতুন ‘ফোর্সড লেবার’ শুল্ক কার্যত শুক্রবার শেষ হওয়া সেকশন ১২২-এর ১০ শতাংশ শুল্কের জায়গা নিচ্ছে।
তবে ট্রাম্প প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এ ব্যাখ্যা নাকচ করে বলেন, এটি আগের শুল্কের সরাসরি বিকল্প নয়। বরং জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের কঠোর নীতিরই অংশ।
সাবেক মার্কিন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা ও বর্তমানে বাণিজ্য আইনজীবী রায়ান মেজেরাস বলেন, সেকশন ৩০১ অতীতে আদালতে টিকে থাকায় নতুন শুল্ক আইনি চ্যালেঞ্জে বাতিল করা আরও কঠিন হতে পারে।
যেসব পণ্য শুল্কমুক্ত থাকবে
প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জ্বালানি তেল ও গ্যাস, সার, কিছু খাদ্যপণ্য এবং জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে আগে থেকেই সেকশন ২৩২-এর আওতায় শুল্কের মুখে থাকা গাড়ি, ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম ও তামার মতো পণ্য নতুন শুল্কের আওতার বাইরে থাকবে।
এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো-কানাডা বাণিজ্য চুক্তি (ইউএসএমসিএ)-এর শর্ত পূরণকারী পণ্যও শুল্কমুক্ত থাকবে। উত্তর আমেরিকার সমন্বিত সরবরাহ ব্যবস্থা এবং এসব পণ্যে যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চমাত্রার উপাদান ব্যবহারের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এনএনবাংলা/
