সাম্প্রতিক
Skip to content

সৌদিতে ২ বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: পৃথক অভিযোগে গ্রেপ্তার, কনস্যুলেটের চিঠিতে নতুন তথ্য

প্রতীকী ছবি। এআই সাহায্যে তৈরি

সৌদি আরবের মক্কায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশিকে পৃথক অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তাদের একজন সাইবার বা তথ্যপ্রযুক্তি আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে এবং অন্যজন ব্যভিচারের অভিযোগে আটক হন।

২০২৩ সালের আগস্টে গ্রেপ্তারের পর তারা আড়াই মাসেরও বেশি সময় কারাগারে ছিলেন। তবে তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে সৌদি কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ মিশনকে কিছু জানায়নি বলে জানিয়েছে জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেট।

ঢাকায় প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিবকে পাঠানো জেদ্দা কনস্যুলেটের শ্রম কল্যাণ উইংয়ের ১৮ অক্টোবরের এক চিঠিতে এসব তথ্য উঠে এসেছে। চিঠি অনুযায়ী, বাংলাদেশি পুরুষকে ২০২৩ সালের ১ আগস্ট গ্রেপ্তার করে জেদ্দা সংশোধনাগারে রাখা হয়। এর পরদিন, ২ আগস্ট গ্রেপ্তার হওয়া বাংলাদেশি নারীকে রাখা হয় জেদ্দা মহিলা কারাগারে।

মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া ওই দুই বাংলাদেশি সৌদি আরবের আল মাজাল কোম্পানিতে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন। তাদের একজনের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়, অন্যজনের বাড়ি টাঙ্গাইলে।

আলাদা অভিযোগে গ্রেপ্তার, মৃত্যুদণ্ডের তথ্য নিয়ে অস্পষ্টতা
কনস্যুলেটের শ্রম কল্যাণ উইংয়ের চিঠিতে বলা হয়েছে, পৃথক অভিযোগে গ্রেপ্তার হলেও তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দেয়নি সৌদি কর্তৃপক্ষ। অথচ সৌদি সংবাদমাধ্যমে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতির বরাতে বলা হয়েছে, মক্কার একটি মসজিদে ‘অনৈতিক কাজে লিপ্ত’ হওয়ার অভিযোগে ওই নারী ও পুরুষের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে।

শ্রম কল্যাণ উইংয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, সাইবার অপরাধ বা এ ধরনের অভিযোগে এর আগে কোনো বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের নজির পাওয়া যায়নি। একইভাবে বিভিন্ন চারিত্রিক মামলায় আটক বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেও আগে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার কোনো প্রমাণ তাদের কাছে নেই।

বন্দিদের তালিকায় নাম থাকলেও ছিল না সাজার তথ্য
সৌদি আরবের পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন কারাগারে নানা অপরাধের অভিযোগে আটক বাংলাদেশিদের বিষয়ে তথ্য চেয়েছিল জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেট। এর পরিপ্রেক্ষিতে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় চলতি বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর একটি তালিকা দেয়। ওই তালিকায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশির নাম ও পরিচয় থাকলেও তাদের সাজার কোনো তথ্য উল্লেখ ছিল না।

কনস্যুলেটের চিঠিতে বলা হয়, তালিকার সাত নম্বর কলামে রায় ঘোষিত বন্দিদের সাজা সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত বিবরণ থাকার কথা। কিন্তু ওই দুই বাংলাদেশির নামের পাশে কোনো সাজা উল্লেখ করা হয়নি।

তালিকার তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবের পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন কারাগারে চারিত্রিক মামলায় ৩০৬ জন বাংলাদেশি আটক রয়েছেন। তাদের মধ্যে ১৪৭ জনের সাজা ঘোষণা করা হয়েছে। সাজাপ্রাপ্তদের কারাদণ্ডের মেয়াদ সর্বনিম্ন এক মাস থেকে সর্বোচ্চ ১৫ বছর। এ ছাড়া সাইবার অপরাধের তিনটি পৃথক মামলায় বাংলাদেশিদের ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে বাংলাদেশকে জানানো হয়নি
গত ১৪ অক্টোবর সৌদি কর্তৃপক্ষ দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর জানায়। সৌদি প্রেস এজেন্সির প্রতিবেদনে তাদের একজন নারী ও অন্যজন পুরুষ বলে উল্লেখ করা হয়।

এরপর ১৫ অক্টোবর জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেট সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি দিয়ে তাদের পরিচয়, মামলা ও মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানতে চায়। কনস্যুলেটের এক কর্মকর্তা জানান, ওই দুই বাংলাদেশির বিচারপ্রক্রিয়া কিংবা মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে কোনো নোটিফিকেশন, কূটনৈতিক পত্র বা অন্য কোনো মাধ্যমে বাংলাদেশ মিশনকে জানানো হয়নি।

১৭ অক্টোবর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেন, সরকার তখনও আনুষ্ঠানিকভাবে এ বিষয়ে কোনো তথ্য পায়নি। দুই বাংলাদেশির পরিচয়, তারা কত দিন ধরে সৌদি আরবে কাজ করছিলেন এবং তাদের নিয়োগকর্তা কে ছিলেন—এসব বিস্তারিত জানতে সৌদি কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনাকে দুর্ভাগ্যজনক উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী সৌদি আরবের স্থানীয় আইনের কঠোরতার বিষয়টিও তুলে ধরেন।

সৌদি রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠক, তথ্য চেয়েছে সরকার
ঘটনাটি নিয়ে সর্বশেষ ১৮ অক্টোবর ঢাকায় সৌদি রাষ্ট্রদূত আবদুল্লাহ বিন জাফর এইচ বিন আবিয়ারের সঙ্গে বৈঠক করে বাংলাদেশ সরকার। বৈঠকে মক্কায় দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয়।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান, সৌদি রাষ্ট্রদূতকে বৈঠকে ডেকে এর আগে সৌদি সরকারের কাছে পাঠানো নোট ভার্বালের একটি অনুলিপি হস্তান্তর করা হয়েছে।

এদিকে, জেদ্দা কনস্যুলেটের শ্রম কল্যাণ উইংয়ের চিঠিতে বলা হয়েছে, দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ডের রায়ের অনুলিপি পাওয়ার পর এ বিষয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন পাঠানো হবে।

বিচারপ্রক্রিয়ায় কনস্যুলেটের সীমাবদ্ধতা
চিঠিতে সৌদি আরবে বাংলাদেশ মিশনের আইনি সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতার কথাও তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়, সৌদি ক্রিমিনাল কোর্টসহ অন্যান্য আদালতে শুনানির সময় ‘মারকাযুত তারজামাহ আল মুওয়াহহিদ’ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অনুবাদক নিয়োগ করা হয়। ফলে আসামির পক্ষে অনুবাদক হিসেবে বাংলাদেশ মিশনের যুক্ত হওয়ার সুযোগ থাকে না।

সাধারণত মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধে গ্রেপ্তার কোনো বাংলাদেশির পরিবার দূতাবাস, কনস্যুলেট কিংবা প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে আইনি সহায়তার আবেদন করে থাকে। কিন্তু মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া এই দুই বাংলাদেশির পরিবারের পক্ষ থেকে এমন কোনো আবেদন বা যোগাযোগ করা হয়নি বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

একই সঙ্গে সৌদি কর্তৃপক্ষও তাদের মৃত্যুদণ্ডের রায় কিংবা তা কার্যকরের বিষয়ে বাংলাদেশ মিশনকে আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি বলে দাবি করা হয়েছে।

মৃত্যুদণ্ডের মতো গুরুতর শাস্তির বিচারপ্রক্রিয়া ও রায় কার্যকরের বিষয়ে বাংলাদেশ মিশনকে অবহিত না করা হয়ে থাকলে তা বিস্ময়কর বলে মনে করছেন বিশ্লেষকদের কেউ কেউ। তবে দুই বাংলাদেশির মামলার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ ও রায়ের অনুলিপি পাওয়া গেলে বিষয়টি সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানা যাবে।

এনএনবাংলা/