শিগগিরই খুলছে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার, ‘বিনা খরচে’ যাবেন ১০ হাজার কর্মী

বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য শিগগিরই আবারও খুলতে যাচ্ছে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার। নতুন করে কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি অভিবাসন ব্যয় কমানো এবং সিন্ডিকেট ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বন্ধে গুরুত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশ সরকার।
এরই মধ্যে বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ অনুরোধে প্রথম ধাপে ১০ হাজার কর্মীকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে বা ‘জিরো কস্টে’ মালয়েশিয়ায় নেওয়ার বিষয়ে দেশটির কর্তৃপক্ষ নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিমান ভাড়াসহ সব ধরনের অভিবাসন ব্যয় ছাড়াই এসব কর্মীকে মালয়েশিয়ায় পাঠানো হবে। প্রথম বহর সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেডের (বোয়েসেল) মাধ্যমে বিশেষ চার্টার্ড ফ্লাইটে মালয়েশিয়ায় পাঠানোর মধ্য দিয়ে শ্রমবাজার পুনরায় চালুর কার্যক্রম শুরু হবে।
শ্রমবাজার খুলতে দুই দেশের উচ্চপর্যায়ে আলোচনা
দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালু করতে দুই দেশের মন্ত্রী পর্যায়ে একাধিক বৈঠক হয়েছে। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফরে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম এবং রাজা সুলতান ইব্রাহিম ইস্কান্দারের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
সরকার বলছে, বাংলাদেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সরাসরি আলোচনা ও নেগোসিয়েশনের মাধ্যমে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় উন্মুক্ত করার পথ তৈরি হয়েছে।
৩৩৮ রিক্রুটিং এজেন্সির জন্য সুযোগ
২০২২ সালের ১৮ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর জন্য বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সি বাছাইয়ের দায়িত্ব মালয়েশিয়া সরকারের ওপর ন্যস্ত রয়েছে। ওই সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।
মালয়েশিয়া সরকারের মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, কর্মী সরবরাহকারী পাঁচটি প্রধান দেশের মধ্যে নেপাল ও বাংলাদেশের জন্য ২৫টি করে এবং ভারত, পাকিস্তান ও মিয়ানমারের জন্য ১০টি করে রিক্রুটিং এজেন্সি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য অনুমোদিত ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সি আগের অন্তর্বর্তী সরকার প্রণীত ৪২৩টি এজেন্সির তালিকার অন্তর্ভুক্ত। বাংলাদেশ সরকার অনুরোধ জানিয়েছিল, ওই তালিকায় থাকা ফ্যাসিবাদী সরকারের সময় সুবিধাভোগী ও সিন্ডিকেটের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বাদ দিয়ে বাকি এজেন্সিগুলোকে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর সুযোগ দেওয়া হোক।
দীর্ঘ ছয় মাসের ধারাবাহিক আলোচনার পর মালয়েশিয়া বাংলাদেশকে বিশেষ সুযোগ দিয়েছে বলে জানিয়েছে সরকার। এর আওতায় ২৫টি বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সিকে সরাসরি নির্বাচনের পাশাপাশি আরও ৩১২টি এজেন্সিকে ‘অ্যাসোসিয়েট রিক্রুটমেন্ট এজেন্সি’ হিসেবে কর্মী পাঠানোর সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে সরকারি রিক্রুটিং প্রতিষ্ঠান বোয়েসেলও এই প্রক্রিয়ায় কাজ করবে।
ফলে মোট ৩৩৮টি বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সির মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে কর্মী পাঠানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
এজেন্সি বাছাইয়ে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্টতা নেই
সরকার জানিয়েছে, রিক্রুটিং এজেন্সি যাচাই-বাছাই করেছে মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, দুর্নীতি দমন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত একটি উচ্চপর্যায়ের যৌথ কমিটি।
এই বাছাই প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ সরকারের কোনো সংশ্লিষ্টতা ছিল না বলেও জানানো হয়েছে। আগামী ৩১ ডিসেম্বর বর্তমান সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নতুন সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে রিক্রুটিং এজেন্সি অনুমোদনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বার্থ আরও ভালোভাবে সুরক্ষিত হবে বলে আশা করছে সরকার।
১৬ মেডিকেল সেন্টার দিয়ে শুরু হচ্ছে কার্যক্রম
শ্রমবাজার দ্রুত চালুর লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার বিদ্যমান মেডিকেল সেন্টারের তালিকা পরিবর্তনের অনুরোধ জানিয়েছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে মালয়েশিয়া সরকার অনুমোদিত তালিকা থেকে বিতর্কিত ও ফ্যাসিবাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মেডিকেল সেন্টারগুলো বাদ দিয়ে অবশিষ্ট ১৬টি মেডিকেল সেন্টারের মাধ্যমে কার্যক্রম শুরুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
তবে পরবর্তী সময়ে মালয়েশিয়ার স্বাস্থ্য, মানবসম্পদ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে এসে মেডিকেল সেন্টারগুলো সরেজমিনে পরিদর্শন করবে। নতুন নীতিমালার আলোকে যাচাই-বাছাই শেষে পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রণয়ন করা হবে।
কর্মীদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিতের উদ্যোগ
মালয়েশিয়ায় যাওয়া কর্মীদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিমানবন্দরে অতীতের হয়রানি বন্ধ, সরাসরি সংশ্লিষ্ট কোম্পানিতে কাজে যোগদান এবং মালয়েশিয়ার শ্রম আইন অনুযায়ী নিয়মিত বেতন-ভাতা, আবাসন ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।
অভিবাসন সংক্রান্ত অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ২৪ ঘণ্টার মনিটরিং সেল ও হেল্পডেস্ক স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
বিজ্ঞপ্তির আগে লেনদেন নয়
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ধরনের বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর বিষয়ে সতর্ক করেছে সরকার। জনশক্তি পাঠানোর সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া এখনো চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে এবং যথাসময়ে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বিস্তারিত জানানো হবে।
তাই মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তি বা নির্দেশনা জারি না হওয়া পর্যন্ত কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেন না করার আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে আগেভাগে মেডিকেল টেস্ট করা কিংবা পাসপোর্ট জমা না দেওয়ার জন্যও সতর্ক করা হয়েছে।
এনএনবাংলা/

