নিউইয়র্কে ঊনবাঙালের ‘সপ্তসুর’: সাত কিংবদন্তির ২৩ কালজয়ী গানে মুগ্ধ দর্শক-শ্রোতা

নিউইয়র্কে প্রবাসী সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চা কেন্দ্র ঊনবাঙালের আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয়েছে সংগীত ও সাহিত্যভিত্তিক ব্যতিক্রমী অনুষ্ঠান ‘সপ্তসুর’। তিন মাসের প্রস্তুতির পর শুক্রবার সন্ধ্যায় জ্যাকসন হাইটসের জুইস সেন্টারে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে বাংলা গানপ্রেমীদের উপস্থিতিতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো মিলনায়তন।
বাংলা সংগীতের সাত বরেণ্য সুরস্রষ্টা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, লালন ফকির, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, হাসন রাজা, শাহ আব্দুল করিম ও রাধারমণ দত্তের ২৩টি কালজয়ী গান নিয়ে সাজানো হয় ‘সপ্তসুর’। ঊনবাঙালের সংগীত বিভাগের পরিচালক শিল্পী মিতা হোসেনের নির্দেশনায় সংগীত বিভাগের শিল্পীরা গানগুলো পরিবেশন করেন। দর্শক-শ্রোতারা মন্ত্রমুগ্ধের মতো উপভোগ করেন বাংলা সংগীতের বৈচিত্র্যময় এই আয়োজন।
অনুষ্ঠানে কণ্ঠ দেন বুলা আফরোজ, মোহাম্মদ শানু, সানজানা তাসমিন, আরিফ আহমেদ অর্ণব, রেজা কামাল, নজরুল ইসলাম, আবিদা সুলতানা, মুক্তি জহির, চমক ইসলাম, রেণু রোজা, দেলোয়ারা কামাল, নাসির উদ্দিন, মুন্না চৌধুরী ও শাহীনূর শাণূ নদী। যন্ত্রসংগীতে ছিলেন রবিউল হাসান রুবেল, পিনু সেন ও মোহাম্মদ শানু।
ঊনবাঙালের প্রতিষ্ঠাতা কবি কাজী জহিরুল ইসলামের সূচনা বক্তব্যের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের শুরু হয়। পরে শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মনজুর আহমদ এবং সাপ্তাহিক বাংলাদেশ-এর সম্পাদক ওয়াজেদ এ খান। তাঁরা প্রবাসে শিল্প-সাহিত্যচর্চার মাধ্যমে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির শেকড় ধরে রাখার এই উদ্যোগের প্রশংসা করেন।
সংগীতের পাশাপাশি অনুষ্ঠানটি সাজানো হয় কবিতা আবৃত্তি ও স্বরচিত কবিতা পাঠের আয়োজনেও। কবিতা আবৃত্তি করেন আহসান হাবিব, জিএম ফারুক খান, জান্নাত সুলতানা ও সুমন শামসুদ্দিন। স্বরচিত কবিতা পাঠে অংশ নেন সোহেল হামিদ, সাইফুস সানী, মুশফিক চৌধুরী, শেখ মিজান, রেণু রোজা, রওশন হক ও দীপ্তি বড়ুয়া।
পুরো অনুষ্ঠানটি পরিচালনা ও উপস্থাপনা করেন শাহীনূর শাণূ নদী। তাঁকে সহযোগিতা করেন কাজী ফৌজিয়া, মুন্না চৌধুরী ও নাসির উদ্দিন।

সাহিত্যচর্চা থেকে সংগীতের বিস্তৃত পরিসরে ঊনবাঙাল
নিউইয়র্কে বাংলা সাহিত্য, সংগীত ও শিল্পচর্চার একটি অলাভজনক সংগঠন ঊনবাঙাল দীর্ঘদিন ধরে প্রবাসে বাংলা সংস্কৃতির বিকাশে কাজ করে যাচ্ছে। একুশের বইমেলা থেকে শুরু করে বাংলাদেশের বিভিন্ন জাতীয় ও সাংস্কৃতিক দিবস উপলক্ষে নিয়মিত অনুষ্ঠান আয়োজন করে সংগঠনটি।
কবি কাজী জহিরুল ইসলাম ও মুক্তি জহিরের নেতৃত্বে লেখালেখি, কবিতা পাঠ ও সাহিত্যচর্চার মধ্য দিয়ে ঊনবাঙালের পথচলা শুরু হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সংগঠনটি তার কার্যক্রমের পরিধি বাড়িয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি শিল্পী মিতা হোসেনের নেতৃত্বে চালু হয়েছে সংগীত বিভাগ।
যাঁরা গান জানেন, কিন্তু নিয়মিত চর্চার অভাবে নিজেদের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ পান না, তাঁদের সংগীতচর্চায় ফিরিয়ে আনা এবং নতুন শিল্পীদের নিয়ে সংগীতের দল গড়ে তোলা এই বিভাগের অন্যতম লক্ষ্য।
‘সপ্তসুর’ সেই উদ্যোগেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ। বাংলা গানের সাত কিংবদন্তিকে শ্রদ্ধা জানানোর পাশাপাশি বিভিন্ন প্রজন্মের শিল্পীদের এক মঞ্চে নিয়ে আসার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানটি প্রবাসে সংগীতচর্চার নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
নিউইয়র্কে রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলসংগীত ও লালনসংগীত নিয়ে বিভিন্ন সময়ে নানা আয়োজন হলেও সাতজন বরেণ্য সুরস্রষ্টার গানকে এক সূত্রে গেঁথে এমন বিস্তৃত সংগীতানুষ্ঠান ঊনবাঙালের সাংস্কৃতিক উদ্যোগে স্বতন্ত্র মাত্রা যোগ করেছে। সংগীত ও কবিতার সমন্বয়ে পুরো আয়োজন হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত, আন্তরিক ও উপভোগ্য।
প্রবাসে বাংলা সংস্কৃতির চর্চা কেবল অনুষ্ঠান আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভাষা, ঐতিহ্য ও শেকড়কে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব। ঊনবাঙালের ‘সপ্তসুর’ সেই দায়িত্ব পালনের একটি উল্লেখযোগ্য প্রচেষ্টা।
অনুষ্ঠানটির সফল বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট আয়োজক, শিল্পী, কবি, আবৃত্তিকার, যন্ত্রসংগীতশিল্পী ও কলাকুশলীদের সম্মিলিত ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের আন্তরিক প্রচেষ্টায় নিউইয়র্কের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে যুক্ত হলো বাংলা সংগীত ও সাহিত্যচর্চার আরেকটি স্মরণীয় অধ্যায়।
এনএনবাংলা/
