Skip to content

বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন

ফাইনাল শেষে মারপিট: যে ধরনের শাস্তির মুখে পড়তে পারে আর্জেন্টিনা

বিশ্বকাপ ফাইনালের শেষ বাঁশি বাজার পর মাঠে ঘটে যাওয়া অপ্রীতিকর ঘটনার জেরে আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করতে যাচ্ছে ফিফা। যুক্তরাষ্ট্রের মেটলাইফ স্টেডিয়ামে স্পেনের বিপক্ষে ফাইনাল শেষে কী ঘটেছিল, তা খতিয়ে দেখতে ফিফার শৃঙ্খলা কমিটি একজন শৃঙ্খলা ও নৈতিকতা বিষয়ক প্রসিকিউটর নিয়োগ করেছে।

তদন্তে খেলোয়াড়, কোচিং স্টাফ কিংবা আর্জেন্টাইন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এএফএ)-এর বিরুদ্ধে শৃঙ্খলাভঙ্গের প্রমাণ মিললে নিষেধাজ্ঞা বা আর্থিক জরিমানার মতো শাস্তি দেওয়া হতে পারে।

রবিবারের ফাইনালে স্পেন ১-০ গোলে জয় নিশ্চিত করে বিশ্বকাপ শিরোপা জেতার পর উদযাপনে মেতে ওঠে। ঠিক সেই সময় আর্জেন্টিনার কয়েকজন খেলোয়াড় ও স্টাফের সঙ্গে স্পেনের ফুটবলারদের বাকবিতণ্ডা ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে।

ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, নাহুয়েল মোলিনা, লিয়ান্দ্রো পারেদেস, থিয়াগো আলমাদা এবং সহকারী কোচ রবার্তো আয়ালা এই ঘটনায় জড়িয়ে পড়েন। শুরুতে ফিফা জানায়, স্পেনের এরিক গার্সিয়ার গলায় ধাক্কা দেওয়ায় রেফারি স্লাভকো ভিনচিচ পারেদেসকে লাল কার্ড দেখিয়েছেন। তবে কিছু সময় পর সেই লাল কার্ডের তথ্য অফিসিয়াল নথি থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। পরে ফিফা বিবিসি স্পোর্টকে নিশ্চিত করে, ম্যাচ শেষে পারেদেসের বিরুদ্ধে কোনো তাৎক্ষণিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

এর আগে অবশ্য আর্জেন্টিনা ১০ জনের দলে পরিণত হয়েছিল। দ্বিতীয়ার্ধের যোগ করা সময়ে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন এনজো ফার্নান্দেজ।

এদিকে, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালে জয় পাওয়ার পর ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের ওপর আর্জেন্টিনার দাবির সমর্থনে ‘Las Malvinas son Argentinas’ লেখা ব্যানার প্রদর্শনের ঘটনাও আলাদাভাবে তদন্ত করছে ফিফা। এ বিষয়েও এএফএর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

ফাইনালের পর ঠিক কী ঘটেছিল?

শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে লিওনেল মেসিসহ কয়েকজন আর্জেন্টাইন খেলোয়াড় হতাশায় মাঠে লুটিয়ে পড়েন। অন্যদিকে স্পেনের ফুটবলাররা শিরোপা উদযাপনে ছড়িয়ে পড়েন পুরো মাঠে। অতিরিক্ত সময়ে বদলি হওয়া রদ্রি ডাগআউট থেকে দৌড়ে সতীর্থদের সঙ্গে যোগ দিতে যান।

ঠিক তখনই রদ্রিকে মোলিনার বাহু বা পেটের দিকে ঘুষি মারতে দেখা যায়। সেখান থেকেই দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরে এরিক গার্সিয়া এগিয়ে এলে পারেদেস তার গলার দিকে আঙুল দিয়ে খোঁচা দেন।

পরিস্থিতি শান্ত করতে এগিয়ে আসা স্পেনের বদলি খেলোয়াড় গাভিকে থিয়াগো আলমাদা মাটিতে ফেলে দেন বলেও ভিডিওতে দেখা যায়। এরপর পারেদেস স্পেনের এক খেলোয়াড়কে মুখে হাত দিয়ে ধাক্কা মেরে ফেলে দেন। সহকারী কোচ রবার্তো আয়ালাকেও গার্সিয়ার গলার কাছে হাত দিতে এবং পরে দানি ওলমোর ওপর আঘাত করতে দেখা যায়।

বিবিসি ওয়ানের ধারাভাষ্যে ইংল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক অ্যালান শিয়ারার বলেন, “পারেদেস কয়েকটি জোরালো ঘুষি ছুড়ে মেরেছে। এর কোনো যৌক্তিকতা নেই। হার মেনে নেওয়ারও একটি সংস্কৃতি আছে। আর্জেন্টিনার কাছ থেকে আমরা এমন প্রতিক্রিয়া আগেও দেখেছি।”

সাবেক গোলরক্ষক জো হার্টও ঘটনার কড়া সমালোচনা করে বলেন, “ম্যাচ শেষ হয়ে গেছে। আজ যা হয়েছে, তা নিয়ে অভিযোগ করার কোনো সুযোগ তাদের নেই। এটি অত্যন্ত জঘন্য আচরণ।”

তবে আর্জেন্টিনার প্রধান কোচ লিওনেল স্কালোনি বিষয়টিকে অতটা বড় করে দেখেননি। ম্যাচ শেষে তিনি বলেন, “জয়ের সময় যেমন উদার হতে হয়, পরাজয়ের সময়ও তেমন উদার থাকতে হয়। আজ আমরা দেখিয়েছি, আমরা হারও মেনে নিতে জানি। আমরা ম্যাচ হেরেছি, সেটি স্বীকার করছি। তবে এজন্য আমরা আমাদের পুরো পথচলাকে ভুলে যেতে পারি না।”

কী ধরনের শাস্তি হতে পারে?

ফিফার শৃঙ্খলা কমিটির সামনে বিভিন্ন ধরনের শাস্তির সুযোগ রয়েছে। প্রসিকিউটর সম্ভাব্য সহিংস আচরণের পাশাপাশি ফেয়ার প্লে লঙ্ঘন, অসদাচরণ এবং ফুটবলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে কি না—সব বিষয়ই তদন্ত করবেন।

ফিফার শৃঙ্খলা বিধিমালার ১৩ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ‘শোভন আচরণের মৌলিক নিয়ম লঙ্ঘন’ কিংবা ‘ফিফা ও ফুটবলের সুনাম ক্ষুণ্নকারী আচরণ’ প্রমাণিত হলে খেলোয়াড়, কোচিং স্টাফ বা জাতীয় ফুটবল সংস্থার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। প্রসিকিউটরের বৈশ্বিকভাবে নিষেধাজ্ঞা সুপারিশ করার ক্ষমতাও রয়েছে।

আগেও এমন ঘটনায় কঠোর শাস্তি দিয়েছে ফিফা

এর আগে স্পেনের সাবেক ফুটবল ফেডারেশন সভাপতি লুইস রুবিয়ালেস নারী বিশ্বকাপ জয়ের পর জেনি এরমোসোর ঠোঁটে চুমু দেওয়ার ঘটনায় তিন বছরের জন্য সব ধরনের ফুটবল-সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ড থেকে নিষিদ্ধ হয়েছিলেন।

২০১৪ বিশ্বকাপে ইতালির জর্জিও কিয়েলিনিকে কামড় দেওয়ার ঘটনায় উরুগুয়ের লুইস সুয়ারেজ চার মাসের জন্য ফুটবল-সংশ্লিষ্ট সব কার্যক্রম থেকে নিষিদ্ধ হয়েছিলেন। তবে বর্তমান ঘটনায় মোলিনা, পারেদেস, আলমাদা বা আয়ালার বিরুদ্ধে এত দীর্ঘ নিষেধাজ্ঞা হওয়ার সম্ভাবনা কম বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

এএফএর বিরুদ্ধে আগেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল

আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের আচরণ নিয়ে অতীতেও একাধিকবার বিতর্ক হয়েছে। ২০২২ বিশ্বকাপ জয়ের পর উদযাপনের সময় ‘আপত্তিকর আচরণ’ ও ‘ফেয়ার প্লে নীতিমালা লঙ্ঘনের’ অভিযোগে এএফএকে ১৮ হাজার ৩০০ পাউন্ড জরিমানা করা হয়েছিল।

সেই আসরে গোল্ডেন গ্লাভস জয়ের পর এমিলিয়ানো মার্তিনেজের অশোভন উদযাপন এবং পরে কিলিয়ান এমবাপ্পেকে বিদ্রূপ করার ঘটনাও ব্যাপক সমালোচিত হয়েছিল।

পরবর্তীতে ২০২৪ সালে চিলি ও কলম্বিয়ার বিপক্ষে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে আপত্তিকর আচরণের দায়ে মার্তিনেজকে দুই ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। চিলির বিপক্ষে জয় শেষে বিতর্কিত উদযাপন এবং কলম্বিয়ার বিপক্ষে হারের পর এক ক্যামেরাম্যানের ক্যামেরায় গ্লাভস দিয়ে আঘাত করার ঘটনাও শাস্তির কারণ ছিল।

একই বছরে কোপা আমেরিকা জয়ের পর এনজো ফের্নান্দেজের পোস্ট করা একটি ভিডিও নিয়েও সমালোচনা হয়। ফরাসি ফুটবল ফেডারেশন সেটিকে বর্ণবাদী ও বৈষম্যমূলক স্লোগান সম্বলিত বলে অভিযোগ তোলে, পরে এ জন্য ক্ষমাও চান এনজো।

ফকল্যান্ড ব্যানার নিয়েও শাস্তির ঝুঁকি

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনাল জয়ের পর ‘Las Malvinas son Argentinas’ লেখা ব্যানার প্রদর্শনের কারণেও এএফএ জরিমানার মুখে পড়তে পারে। এর আগে ২০১৪ সালে একই ধরনের ব্যানার প্রদর্শনের ঘটনায় আর্জেন্টিনাকে ২০ হাজার পাউন্ড জরিমানা করেছিল ফিফা।

এই ঘটনায় ব্যানার হাতে থাকা ক্রিস্তিয়ান রোমেরো, জিওভানি লো সেলসো এবং লিসান্দ্রো মার্তিনেজের বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।

উল্লেখ্য, ইউরো ২০২৪ জয়ের পর ‘জিব্রাল্টার স্পেনের’ স্লোগান দেওয়ায় স্পেন অধিনায়ক আলভারো মোরাতা ও রদ্রিকে এক ম্যাচ করে নিষিদ্ধ করেছিল উয়েফা।

তদন্ত শেষ হতে সময় লাগতে পারে

ফিফা এখনো তদন্ত শেষ করার কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা জানায়নি। অতীতে এমন তদন্ত শেষ হতে কয়েক মাসও লেগেছে।

উদাহরণ হিসেবে, ১৮ ফেব্রুয়ারি উয়েফা বেনফিকার জিয়ানলুকা প্রেস্তিয়ানির বিরুদ্ধে কথিত বর্ণবাদী মন্তব্যের অভিযোগে তদন্ত শুরু করেছিল। দুই মাসেরও বেশি সময় পর, ২৪ এপ্রিল তাকে সমকামীবিদ্বেষী আচরণের দায়ে ছয় ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়, যার মধ্যে তিন ম্যাচের শাস্তি দুই বছরের জন্য স্থগিত রাখা হয়েছিল।

এনএনবাংলা/