বিয়ে করতে রাজি না হওয়ার অভিনেত্রীকে নির্যাতনের অভিযোগ

বর্তমান সময়ের আলোচিত ঢাকাই সিনেমার মডেল ও অভিনেত্রী স্নিগ্ধা চৌধুরীকে বিয়ের জন্য চাপ দিয়ে ব্যর্থ হয়ে টানা দুই ঘণ্টা নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে আশিয়ান গ্রুপ ও আশিয়ান ল্যান্ডস ডেভেলপমেন্ট লিমিটেডের চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে। একই ঘটনায় তার সঙ্গে থাকা মডেল কো-অর্ডিনেটর ইমনকেও মারধর এবং পায়ের নখ তুলে ফেলার অভিযোগ করা হয়েছে।
হালের কয়েকটি ঢালিউড সিনেমায় প্রধান নারী চরিত্রে অভিনয় করে পরিচিতি পাওয়া স্নিগ্ধা চৌধুরী দাবি করেন, গত ২৪ জুলাই রাত ৯টা থেকে ১১টা পর্যন্ত তাকে হাত-পা বেঁধে মারধর করা হয়। তার শরীরে কুসুম গরম কফি ঢেলে দেওয়া হয়, অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করা হয় এবং শেষ পর্যন্ত কফিতে নেশাজাত বা বিষাক্ত দ্রবণ মিশিয়ে পান করানো হয়। একই সময় তার সঙ্গে থাকা ইমনকেও নির্যাতন করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
ঘটনার বর্ণনায় স্নিগ্ধা জানান, প্রায় এক বছর ধরে পরিচিত কো-অর্ডিনেটর ইমন একটি প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনচিত্রে কাজের প্রস্তাব দেন। ২০ লাখ টাকার ওই কাজের জন্য তাকে ১৭ লাখ টাকা দেওয়ার কথা জানিয়ে চুক্তি স্বাক্ষরের উদ্দেশ্যে ২৪ জুলাই রাত সাড়ে ৮টার দিকে রাজধানীর ৩০০ ফিট এলাকার আশিয়ান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
সেখানে পৌঁছে নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে তার সন্দেহ হলেও ভেতরে গিয়ে তিনি আশিয়ান গ্রুপের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম ভূঁইয়াকে দেখতে পান। তার সঙ্গে ছিলেন পলাশ, পিএস মিয়ামিসহ কয়েকজন সহযোগী। প্রথমে আপ্যায়নের পর হঠাৎ নজরুল তাকে ‘জেবা তাকিয়া’ ভেবে বিভিন্ন অভিযোগ করতে থাকেন এবং দাবি করেন, তিনি তার কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা নিয়েছেন। স্নিগ্ধা বারবার নিজের পরিচয় দিলেও তা মানতে অস্বীকৃতি জানান নজরুল।
অভিযোগ অনুযায়ী, একপর্যায়ে নজরুল একটি ফাঁকা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর করতে চাপ দেন এবং তলোয়ার সদৃশ ধারালো অস্ত্র দেখিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন করেন। প্রাণভয়ে স্নিগ্ধা ভিন্ন নামে স্বাক্ষর করেন। এরপর কক্ষ থেকে অন্যদের বের করে দিয়ে তাকে বিয়ে ও বাসর করার জন্য চাপ দেওয়া হয়। মাসিক চলার কথা জানালে ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
স্নিগ্ধার ভাষ্য, এরপর তার হাত-পা রশি দিয়ে শক্ত করে বেঁধে ফেলা হয়। গালে চড় মারা, গলা চেপে ধরা এবং পায়ের পাতায় মোটা লাঠি দিয়ে ১৪ বার আঘাতসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে নির্যাতন চালানো হয়। পরে নারী পিএস মিয়ামির উপস্থিতিতে তার হাতে গরম কফি ঢেলে দেওয়া হয় এবং নেশাজাতীয় কিছু মেশানো কফি পান করতে বাধ্য করা হয়।
তিনি আরও জানান, একপর্যায়ে নজরুল বুঝতে পারেন তিনি প্রকৃত জেবা তাকিয়া নন। তখন হাত-পায়ের বাঁধন খুলে দেওয়া হলে সুযোগ বুঝে ফিঙ্গারপ্রিন্টযুক্ত দরজা পেরিয়ে বারান্দায় গিয়ে নিচে লাফ দেন। পরে ৩০০ ফিট সড়কে একটি চলন্ত অটোরিকশায় উঠে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে প্রাণে রক্ষা পান।
স্নিগ্ধার দাবি, বাসায় ফিরে তিনি অচেতন হয়ে পড়েন। বর্তমানে তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে নির্যাতনের চিহ্ন রয়েছে।
অভিযোগের পর ঘটনাস্থলে গিয়ে অনুসন্ধানী দল স্নিগ্ধার বর্ণনার সঙ্গে মিল খুঁজে পাওয়ার দাবি করেছে। ফিঙ্গারপ্রিন্ট নিরাপত্তা ব্যবস্থা, পালানোর বারান্দা, নজরুলের কক্ষ এবং তার ঘনিষ্ঠ কর্মচারী পলাশ ও মিয়ামির উপস্থিতির তথ্য মিলেছে বলে জানানো হয়। এছাড়া সেদিনের মোবাইল লোকেশন, অবস্থানের সময় এবং উবার বুকিংয়ের ডিজিটাল স্লিপও যাচাই করে মিল পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে আরও বলা হয়, আশিয়ান মেডিকেলের ভেতরে নজরুলের অফিস কক্ষসংলগ্ন একটি আলাদা কক্ষে কথিত টর্চার সেল রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা কাঞ্চন মাস্টার অভিযোগ করেন, নজরুল প্রায়ই সেখানে বিভিন্ন ব্যক্তিকে এনে নির্যাতন করেন এবং তার ভয়ে কেউ মুখ খোলেন না।
এদিকে ভিডিও কলে ইমনের সঙ্গে যোগাযোগ সম্ভব না হলেও তার স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে নির্যাতন ও পায়ের নখ তুলে ফেলার অভিযোগের সমর্থনে তথ্য পাওয়া গেছে বলে অনুসন্ধানী দলের দাবি। বর্তমানে ইমন অচেতন রয়েছেন বলেও জানানো হয়।
তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আশিয়ান গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম ভূঁইয়া। তিনি বলেন, অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা। পরে স্নিগ্ধার লোকেশন সংক্রান্ত তথ্যের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, চার বছর আগে তিনি স্নিগ্ধাকে চিনতেন। তাকে জানানো হয়, যাকে তিনি জেবা তাকিয়া ভেবেছেন তিনি আসলে স্নিগ্ধা চৌধুরী। এ বিষয়ে পরদিন সকালে কথা বলবেন বলে ফোন কেটে দেন তিনি।
এ ঘটনায় রোববার (২৬ জুলাই) রাতে স্নিগ্ধা চৌধুরী অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে খিলক্ষেত থানায় মামলা দায়ের করেছেন।
